অনিল রায়

২৬ মে ১৯০১ সালে মানিকগঞ্জের বায়রা গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন অনিল রায়। তার পৈতৃক বাড়ি ছিল ঢাকার নবাবগঞ্জ থানার গোবিন্দপুর গ্রামে। ঢাকার বাইরে জন্মগ্রহণ করলেও অনিল রায়ের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি কাটে ঢাকাতে। পিতা অরুণচন্দ্র ছিলেন ঢাকা জেলার সরকারি শিক্ষা বিভাগের উচ্চ পদাধীকারী। প্রথম দিকে ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকায় বসবাস করলেও পরবর্তীতে অরুণচন্দ্র পরিবার-পরিজন নিয়ে তার কেনা নতুন বাড়ি ৭ নম্বর বকসীবাজারে চলে যান।

১৯১৪ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালীন সময়ই অনিল রায় জড়িয়ে পরেন বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে। সে সময় তিনি তাঁতীবাজারে থাকতেন। জানা যায়, ঢাকার আরেক বিপ্লবী টেনা দা তাকে বিপ্লবী দলে রিক্রুট করে।

১৯১৫-১৯১৯ সাল পর্যন্ত অনিল রায় ঢাকার বিপ্লবী দলের সংগঠনিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে একাত্ম রাখে। আপন প্রতিভা গুণে ১৯২০ সালের দিকে ঢাকার সংগঠনের দায়িত্ব চলে আসে তার হাতে। বকসীবাজারের নিজ বাড়িতে অনিল রায় সংগঠনের রিক্রুটমেন্ট অর্থাৎ দলে নতুন সদস্য নেয়ার কাজটি চালিয়ে যান গোপনে।

প্রতিদিন সকালে ডনখানায় শরীরচর্চা, কুস্তি, রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ সাহিত্যচর্চা, গীতা-উপনিষদের অনুশীলন, অশ্বিনী দত্তের ভক্তিযোগ ও অন্যান্য বিপ্লবী-সাহিত্যের আলোচনা, বিপ্লবের তত্ত্ব, বিপ্লবের কৌশল ইত্যাদি ছিল নিত্য দিনকার কর্মকাণ্ড। অনিল রায়ের প্রভাবে ঢাকার বহু তরুণ বিপ্লবী সংগঠনে যুক্ত হয়।

অনিল রায় ১৯১৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষায় পাস করেন। ১৯২১ সালে বিএ পাস ও ১৯২৩ সালে ইংরেজিতে এমএ পাস করেন। তার অসাধারণ মেধার বর্ণনা দিয়েছেন সুনীল দাস তার অনিল রায় শীর্ষক রচনায়- “এম.এ. পরীক্ষার্থরূপে তিনি সংস্কৃতে পরীক্ষা দেবার জন্য তৈরী হচ্ছেন। সংস্কৃতে তাঁর ব্যুৎপত্তিতে অধ্যাপকরা মুগ্ধ। কিন্তু অনিলচন্দ্র শেষ মুহূর্তে পরীক্ষার বিষয় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে সকলকে হতবাক্ করে দিলেন। ইংরাজীতে এম.এ. দেবার প্রস্তুতি সুরু হল। কিন্তু বই কোথায়?

পরীক্ষার জন্য ইংরাজী সাহিত্যের উপযুক্ত বই চাই, অথচ বই কিনবার ব্যবস্থা করে পড়বারও সময় নাই। তাই বক্সীবাজার পাড়ায় তাঁর প্রতিবেশী এম.এ. ক্লাশের সতীর্থ ইংরেজী সাহিত্যের পরীক্ষার্থী লীলা নাগের সঙ্গে যোগযোগ করে তাঁর বই চেয়ে এনে পরীক্ষার পাঠ তৈরী করছেন, আবার কাজ সেনের তাড়াতাড়ি বই ফেরত দিচ্ছেন, যাতে অপর পরীক্ষার্থীর প্রস্তুতিতে বিঘ্ন না ঘটে।

এমনই টানা-পোড়েনের মধ্য দিয়ে পরীক্ষার জন্য তৈরী হয়ে নিলেন। বাংলার তথা ভারতের বৈপ্লবিক সংগ্রামের ইতিহাসে এই যোগাযোগ এক তাৎপর্যময় দিকচিহ্নরূপে স্থায়িত্ব পেয়েছে।”

কর্মব্যস্ততার মাঝেও তিনি নিয়মিত ঢাকা রামকৃষ্ণ মিশনে যাতায়াত করতেন। তার ঘরে ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব ও স্বামী বিবেকানন্দের প্রতিকৃতি ছিল। কিছুটা গম্ভীর প্রকৃতির অনিল রায় নিয়মিত সময় করে দরজা বন্ধ করে ধ্যান-যোগ করতেন। গান গাইতেও ভীষণ ভালবাসতেন তিনি।

বাংলা, হিন্দি, উর্দু ছাড়াও রাম নাম, কীর্তন, ব্রহ্মসঙ্গীত ও স্বামীজীর রচিত গান সব গানই তার কাছে ছিল সমান আকর্ষণীয়। কণ্ঠসঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গীত, সঙ্গীত রচনা সকল কিছুতেই তিনি ছিলেন বেশ পারদর্শী। তার সুরসাধনার পরিণত ফল ‘নবগীতিকা’ সঙ্গীত বইটি ও ‘নেতাজীর ডাক’ নৃত্যনাট্য।

সংগঠনিক কাজে অনিল রায়কে বেশ কয়েকবার কলকাতায় যেতে হয়। ১৯২৬ সালে ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় এক ঘটনায় কতিপয় মুসলমান কোন পল্লীতে আক্রমণ করবে এমন সংবাদের ভিত্তিতে অনিল রায় মাত্র কয়েকজন সদস্য নিয়ে প্রায় খালি হাতে তা প্রতিহত করতে সক্ষম হন। এ ঘটনার পরে মুসলমানরা অনিল রায়ের নাম শুনলেই ভয় পেত বলে জানা যায়।

বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জনসেবার জন্য ঢাকায় তিনি ‘স্যোসাল ওয়েলফেয়ার লীগ’ গঠন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েল রসায়নের অধ্যাপক ও ঢাকা হলের প্রধান ড জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ ছিলেন এর সভাপতি আর অনিল রায় হন সম্পাদক। তবে এ সংগঠনটি ব্যাপক পরিচিত পায় শ্রীসংঘ নামে। বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে বিভিন্ন মেয়াদে বেশ কয়েকবার জেল খাটতে হয়।

কলকাতা থেকে অনিল রায় বোমার খোলের একটি ভাল নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। সেই নমুনাটি দিয়ে বীরেন পোদ্দার ঢাকার কয়েকজন কারিগর দিয়ে বোমার খোল প্রস্তুত করার দিকে মনোযোগী ছিলেন। অন্যদিকে শ্রীসংঘের অন্য সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের দুই গবেষক-ছাত্র শৈলেশ রায় ও অনিল দাস বোমার ফর্মূলা তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন। তাদের সহায়তা করছিল ক্ষিতীশ রায়।

কাজ যখন প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে সে সময় এপ্রিল ১৯৩০ সালে ঢাকায় ঢালাও গ্রেফতারের কারণে কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। সে সময় অনিল রায় কারারুদ্ধ থাকায় তার স্ত্রী লীলা নাগের উপর সংঘের সমস্ত দায়িত্ব বর্তায়।

কলকাতায় গ্রেফতারের পরে অনিল রায়কে ঢাকার জেলে নিয়ে আসা হয়। ঢাকা জেল থেকে কিছুদিন পরে তাকে আলিপুরদুয়ার নিউ সাব-জেলে স্থানান্তর করা হয়। জেলে তাকে চরম নির্যাতন করা হয়। ৩ আগস্ট ১৯৩৮ সালে তিনি নিঃশর্ত মুক্তি পেয়ে ৬ আগস্ট ঢাকায় এসে পৌঁছান।

৯ জুলাই ১৯৪১ সালে অনিল রায় ও তার পরদিন লীলা নাগ পুনরায় গ্রেফতার হন। দুজনেই ২৯ তারিখ মুক্তি পান। ১১ ফেব্রুয়রি ১৯৪২ সালে অনিল রায় আবারো গ্রেফতার হন। এ যাত্রায় তার মাত্র ৬ মাস কারাদণ্ড হলেও নিরাপত্তা বন্দীরূপে জুন ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত দমদম সেন্ট্রাল ও আলিপুর জেলে আটক থাকেন।

বিভিন্ন সময় জেলে থাকাকালীন সময় তিনি বিবাহ ও পরিবারের ক্রমবিকাশ, হেগেল প্রসঙ্গে, ইতিহাসের বস্তবাদী ব্যাখ্যা, সমাজতন্ত্রীর দৃষ্টিতে মার্কসবাদ ইত্যাদি গ্রন্থ রচনা করেন। ৬ জানুয়ারি ১৯৫২ সালে অনিল রায় মারা যান।

মূর্শেদূল মেরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

5 + 4 =

এই শহর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে তথ্য-উপাত্ত্য সংগ্রহ করেছি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তা নিয়ে কিছু একটা করবার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরেই। নানা…

error: Content is protected !!