দুর্গাপূজা

ঢাকার আদি দুর্গাপূজা

-মূর্শেদূল মেরাজ

বাংলা অঞ্চলের সনাতন হিন্দু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান উৎসব দুর্গাপূজা। সনাতন ধর্ম বিশ্বাস মতে, পৌরাণিক দেবতা দুর্গা অপরিশীম শক্তির অধিকারী। ঈশ্বরের এই মহাশক্তি ‘দেবী রূপে প্রকাশ পেয়েছে দুর্গার মধ্য দিয়ে’। দুর্গা শক্তির দেবী। দুর্গা মহামায়া, দশভুজা, ভবানী, শিবানী, আদ্যাশক্তি, সিংহবাহনা নামেও অভিহিত হন। দেবী দুর্গা দুর্গতি নাশ করে সকলের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে বলে তার আরেক নাম ‘দুর্গতিনাশিনী’। এই দেবী দুর্গম নামক অসুরকে বধ করেছিল বলে তাকে দুর্গা বলা হয়। দুর্গার বাহন সিংহ। আশ্বিন মাসের শুক্লাপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে দেবীর বোধন দিয়ে শুরু আর দশমীতে বিসর্জনের মাধ্যমে এ পূজা শেষ হয়।

মা দুর্গা তার কৈলাস পর্বতের শ্বশুরবাড়ি থেকে তার পুত্র-কন্যা নিয়ে মায়ের বাড়িতে নাইওর আসে এ সময়। সে সময় মায়ের বাড়িতে বরণ করে নিতে এই পূজার আয়োজন। মা দুর্গা ধারিত্রীতে আসে অশুভ শক্তিকে দমন করে মানুষকে সুপথে পরিচালনা করার উদ্দেশ্যে। দুর্গার সঙ্গে থাকে তার দুই কন্যা লক্ষ্মী, সরস্বতী আর পুত্র গণেশ ও কার্তিক।

মুক্তধারা প্রকাশিত বাংলা বিশ্বকোষ-এ দুর্গার পরিচয় বর্ণনা করা হয়েছে- “হিন্দুধর্ম মতে, শিবপত্নী ও বিশ্বের আদি কারণ পরমা প্রকৃতি। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতারা নিজ নিজ দেহ হইতে তেজ নির্গত করিলে সেই সমবেত তেজ হইতে যে নারী-মূর্তি উদ্ভব হইল তিনিই দুর্গা। দেবতাগণ তাঁহাকে নিজেদের অস্ত্রসমূহ দান করিলেন। তিনি মহিষাসুরকে ৩ বার বধ করেন।”

ঢাকার একসময় সরম্ভরে আয়োজন করা হত দূর্গাপুজার। এই পূজা প্রথমদিকে ঢাকার ধনাঢ্য হিন্দু জমিদারদের বাড়িতে আয়োজন করা হত। সেসময় শহরের জমিদার বাড়িগুলোর বেশিভাগই ছিল বুড়িগঙ্গা নদীর পারে ঘেঁষে। পরবর্তীতে স্থান সংঙ্কুলান না হওয়ায় শহরের বিভিন্ন অংশে বেশকিছু জমিদার বাড়ি গড়ে ওঠে। অবশ্য সেগুলোও ছিল জলাধারকে কেন্দ্র করেই। বিশেষ করে ধোলাই খালকে কেন্দ্র করে।

১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে বহু হিন্দু পরিবার সীমানার ওপারে চলে গেলে ঢাকায় তাদের পূজা-পাবর্ণে ভাটা পরে। এই পূজা উপলক্ষ্যে প্রতি মণ্ডপের জন্য বিশাল বিশাল মূর্তি নির্মাণ করা হত। অনেক সময় শহরের ধনাঢ্য জমিদারদের মধ্যে পাল্লা দিয়ে চলত মূর্তি ও মণ্ডপ তৈরির কাজ। কে কার চেয়ে ভাল ও সুন্দর করে দেবী মায়ের পুজা দিতে পারে তা নিয়ে রীতিমত প্রতিযোগিতা চলত শহরে।

এছাড়া শহরে আর যে সকল জমিদার বাড়ি ছিল তা মূলত জমিদারদের বাগানবাড়ি হিসেবে গড়ে ওঠে। এই সকল জমিদারবাড়িগুলোর অনেকগুলোই ছিল ঢাকার আশপাশের জমিদারদের। তারা সারাবছর এসব বাড়িতে অবস্থান করতো না। ফসল কাটার পর বা বলতে গেলে খাজনা আদায়ের পর জমিদাররা অবকাস কাটাতে আসতো ঢাকার এই সকল জমিদারবাড়িগুলোতে।

তবে পরবর্তী ইংরেজ শাসনামলে যখন বেশিকিছু পেশাজীবী বিশেষ করে উকিল-মোক্তার-ডাক্তারদের পসার জমে উঠে তারা যখন কোটকাচারী, ওয়ারী, গেণ্ডারিয়া, লালবাগ, বংশাল সব বিভিন্ন এলাকায় বিশাল বিশাল অট্টালিকা গড়ে তোলেন। তখন তারা অনেকেই নিজ নিজ বাড়িতে আড়ম্বরপূর্ণভাবে দুর্গার পূজার আয়োজন করতেন।

উনিশ শতকের ত্রিশ দশকের দিকে ঢাকায় দুর্গাপূজা পালনের কিছু চিত্র অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্তের আত্মজীবনিতে উল্লেখ রয়েছ- “তখন মৈশুন্ডির এক বাড়িতে লাল দুর্গার প্রতিমা এবং সূত্রাপুরে ‘ঢাকার বাবু নন্দলাল’-এর বাড়িতে দোতলার সমান উঁচু প্রতিমার পূঁজা অনুষ্ঠিত হত। রামকৃষ্ণ মিশনের আয়োজন ছিল উল্লেখযোগ্য। সেখানে সন্ন্যাসীরা কীর্তন করতেন। এই পূজা উপলক্ষে থিয়েটার, কীর্তন, ঢপ, যাত্রা অনুষ্ঠিত হত। প্রতিবছর চান্দ্রবছরের নির্দিষ্ট সময়ে পুত্রকন্যাসহ দুর্গা পিত্রালয়ে আসেন ‘নাইয়র’ কাটাতে। জানা যায়, বঙ্গে দুর্গাপূজার প্রচলন করেন সম্রাট আকবরের চোপদার রাজা কংসনারাণ ষোড়শ শতকে।”

ম্যাজিস্ট্রেট বি সি এলেন ঢাকা ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার-এ উল্লেখ করেন- এই সব পূজার সফলতা মূলত নির্ভর করত ধনী জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতা উপর।

১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে বহু হিন্দু পরিবার সীমানার ওপারে চলে গেলে ঢাকায় তাদের পূজা-পাবর্ণে ভাটা পরে। এই পূজা উপলক্ষ্যে প্রতি মণ্ডপের জন্য বিশাল বিশাল মূর্তি নির্মাণ করা হত। অনেক সময় শহরের ধনাঢ্য জমিদারদের মধ্যে পাল্লা দিয়ে চলত মূর্তি ও মণ্ডপ তৈরির কাজ। কে কার চেয়ে ভাল ও সুন্দর করে দেবী মায়ের পুজা দিতে পারে তা নিয়ে রীতিমত প্রতিযোগিতা চলত শহরে।

জেমস ওয়াইজের পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জাতি, বর্ণ ও পেশার বিবরণ গ্রন্থে উল্লেখ করেন- “ঢাকার উত্তরা লের সুজাতপুরের আখড়াটি জনৈক মুসলমানের বাগানের মধ্যে অবস্থিত। …ঢাকার কোন এক নবাব শাহের উদাসীদের জন্য আখড়াটি করে দেন। …আখড়াটির কোন নিদিষ্ট আয়ের উৎস না থাকায় দিনে একবার গোঁসাই শহরে ভিক্ষা করতে বের হন। গোসাইয়ের মতে এর শিষ্যের সংখ্যা ১০০ জন। এরা হিন্দুদের মত শিবরাত্রি, দোলযাত্রা ও দুর্গা পূজার অনুষ্ঠানও আয়োজন করে থাকে।”

ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দশভূজা মন্দির ব্যতিত ঢাকায় আলাদা করে নির্মিত আদি দুর্গা মন্দিরের তেমন দেখা মেলে না। তবে ঢাকার দয়াগঞ্জের ঋষিপাড়া এলাকায় ১৩৪৪ বঙ্গাব্দে নির্মিত একটি দুর্গা মন্দির রয়েছে। এছাড়াও বিসিসি রোড, রায়েরবাগসহ বেশ কয়েকটি দুর্গা মন্দিরের সন্দান পাওয়া গেলেও কোনোটাই খুব প্রাচীন নয়।

একসময় ঢাকায় দুর্গা পূজা উপলক্ষে ভেড়া, বুলবুলি, দোয়েল ও মুনিয়া পাখির লড়াইয়ের আয়োজন করা হত বলেও জানা যায়। বসতো বিভিন্ন এলাকায় মেলা। পুরান ঢাকার শাঁখারি বাজার, ফরাশগঞ্জ, বানিয়াটোলা, লালবাগ সহ বেশ কিছু এলাকায় জমিদারবাড়ি ছাড়াও পাড়ায় মণ্ডপ করে পুজার আয়োজনের কথা জানা যায়।

ঢাকা শহরের নামকরা উকিল মুনশী নন্দলাল দত্ত জমিদারিও ছিলেন। শহরের উজ্জ্বল নগর মহল্লায় তার বাড়ি ছিল। তার বাড়িতে মহা ধুমধামে দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হত। তার অতি চৎমকার নাচঘরে শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, আমলা ও ইংরেজরাও উপস্থিত থাকত। কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত তার চল্লিশের দশকে ঢাকা গ্রন্থে জানা যায়- “জমিদার রূপবাবু রঘুবাবুদের বাড়িতে বিশাল দুর্গা প্রতিমা দর্শনার্থীদের কাছে ছিল বিশেষ আকর্ষণ।”

জেমস ওয়াইজের পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জাতি, বর্ণ ও পেশার বিবরণ গ্রন্থে উল্লেখ করেন- “ঢাকার উত্তরা লের সুজাতপুরের আখড়াটি জনৈক মুসলমানের বাগানের মধ্যে অবস্থিত। …ঢাকার কোন এক নবাব শাহের উদাসীদের জন্য আখড়াটি করে দেন। …আখড়াটির কোন নিদিষ্ট আয়ের উৎস না থাকায় দিনে একবার গোঁসাই শহরে ভিক্ষা করতে বের হন। গোসাইয়ের মতে এর শিষ্যের সংখ্যা ১০০ জন। এরা হিন্দুদের মত শিবরাত্রি, দোলযাত্রা ও দুর্গা পূজার অনুষ্ঠানও আয়োজন করে থাকে।”

…………………………………………………..
প্রাচীন ঢাকার দুর্গা পূজার ছবি পাওয়া যায় না।
লেখায় ব্যবহৃত ছবিটি ১৯৭০ সালের দিকে ভাস্কর শংকর ধরের করা তাঁতীবাজার মণ্ডপের প্রতিমা
ছবি তুলেছেন: নওজেশ আহমেদ

মূর্শেদূল মেরাজ

One Reply to “ঢাকার আদি দুর্গাপূজা”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

13 + seven =

এই শহর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে তথ্য-উপাত্ত্য সংগ্রহ করেছি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তা নিয়ে কিছু একটা করবার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরেই। নানা…

error: Content is protected !!