ঢাকার খেলাধুলা

মুক্তধারা প্রকাশিত বাংলা বিশ্বকোষ-এ খেলাধুলা সম্পর্কে বলা হয়েছে- “দলবদ্ধ বা একক নৈপুণ্যের উপর নির্ভরশীল যে ক্রীড়ায় অংশগ্রহণকারিগণ ও দর্শকগণ আমোদ লাভ করে তাহা। খেলাধুলা মাত্রই বিশেষ পদ্ধতি বা নিয়মের অনসারী ; ইহা একাধারে বিনোদন এবং দৈহিক শক্তি সঞ্চয়ের উপায়, এই দুই-ই।”

আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশ ভেদে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন রকমের খেলাধুলা হয়ে থাকে। এসমস্ত খেলার নিয়মকানুনগুলোও হয়ে থাকে বেশ বৈচিত্র্যময়। কোন কোন খেলা দেশ, জাতি বা গোত্রের সীমানা পেরিয়ে সার্বজনীন হয়ে উঠলেও কোন কোন খেলা থেকে যায় একেবারেই আঞ্চলিক। এসকল আঞ্চলিক খেলার সঙ্গে অন্য অঞ্চলের খেলার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া গেলেও এদের নিয়মনীতিতে পার্থক্য লক্ষণীয়। আধুনিকতার জোয়ার-ভাটায় অনেক খেলা হারিয়ে যায় কালের গর্ভে।

পৃথিবীর বুকে খেলার জন্ম কবে হয়েছিল বা পৃথিবীর অদি খেলা কোনটি তার বিচার-বিশ্লেষণ এ খেলার উপজীব্য নয়। তবে ১৯৪৭ সালের পূর্বে ঢাকার ক্রীড়াঙ্গাণের খেলাগুলোর মধ্যে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এ অংশে আলোচনা করা হয়েছে। এরমধ্যে কিছু খেলা হারিয়ে গেছে ইতিহাসের পাতা থেকে। কিছু খেলা এখনো টিকে আছে। আবার কিছু কিছু খেলা বর্তমানে পেয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা।

ঢাকা থেকে হারিয়ে যাওয়া খেলা থেকে প্রাপ্ত কয়েকটি খেলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যায়। এদের মধ্যে মজাদার ও বৈচিত্র্যময় খেলার মধ্যে মোরগ লড়াই, ডিমের লড়াই, নৌকা বাইচ, কুস্তি, বুলবুলির লড়াই, ঘুড়ি ওড়ান, মালিন্দা, লাঠিখেলা, ঘোড়দৌড়, আরুন্দ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, প্রাপ্ত তথ্য মতে ঢাকার যেসকল খেলার তথ্য পাওয়া যায় তার প্রায় সবগুলোই ধনাঢ্যদের খেলা এবং প্রায় প্রত্যেকটিরই পৃষ্ঠপোষক ছিল শহরের জমিদার, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ। প্রাপ্ত খেলার মধ্যে মাত্র দু’একটিই রয়েছে সাধারণ মানুষের সরাসরি খেলা আর বাকিগুলো কোন না কোনভাবে ধনাঢ্যদের পৃষ্ঠপোষকতায় চলত। তবে বিনোদন প্রিয় ঢাকাবাসী ক্রীড়া প্রতিযোগিতাগুলোকে একধরণের উৎসবের রূপ দিত। এসব খেলার বেশিরভাগই এখন আর নেই।

ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে আগত শাসক বা অধিবাসীদের সঙ্গে সঙ্গে বহু খেলাও এসেছে ঢাকায়। বাইরে থেকে আসা খেলাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ক্রিকেট, বিলিয়ার্ড, পেলো, ফুটবল, টেনিস, হকি উল্লেখযোগ্য।

ঢাকায় ধনাঢ্য ব্যক্তিদের শখের এসমস্ত খেলাকে কেন্দ্র করে ঢাকাতে বেশকিছু পেশারও উদ্ভব ঘটে। যেমন ষাঁড়, হাতি, মেষ, বুলবুলি, মোরগ ইত্যাদি পশু-পাখিগুলোকে খেলার উপযোগী করে তোলার জন্য প্রশিক্ষক ও এগুলোকে দেখাশোনার জন্য প্রশিক্ষিত লোক নিয়োগ করা হত। আবার ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগি হিসেবে জকি শ্রেণীর উদ্ভব হয়। এছাড়াও ঘোড়াগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ ও খাওয়ানর জন্য প্রশিক্ষিত লোক রাখা হত। এছাড়াও ক্রিকেট, ফুটবল, হকি খেলার মাঠ প্রস্তুতের জন্যও ছিল আলাদা পেশাজীবী শ্রেণী।

কামরুদ্দিন আহমদ তার বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ গ্রন্থে পঞ্চাশ বছর আগের ঢাকার স্মৃতিকথায় লিখেছেন- “…মুসলিম হাই স্কুল হকি খেলায়, আমাদের স্কুল ক্রিকেট খেলায় ও অন্যান্য স্কুলগুলো ফুটবল খেলায় পারদর্শি ছিল। ঢাকার সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে ঘুড়ি উড়ানো ছিল বিশেষ প্রিয়। ঢাকার শেষ নবাব খাজা হাবিবুল্লাহ বেশ পয়সা খরচ করে কয়েক নাটাই সূতা মেজে শতখানেক ঘুড়ি নিয়ে শ্রীপঞ্চমীর দিন ছাদে যেতেন-তার খাবারই কেবল ছাদে যেত না-তাকে চামচ দিয়ে খাইতে দিতে হ’ত। এছাড়া পায়রার খেলার প্রতিও ঢাকার লোকের খুব আসক্তি ছিল।”

মূর্শেদূল মেরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

3 × 5 =

এই শহর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে তথ্য-উপাত্ত্য সংগ্রহ করেছি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তা নিয়ে কিছু একটা করবার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরেই। নানা…

error: Content is protected !!