ঢাকার চিত্রকর্ম

মানুষের আদিতম ভাষা হচ্ছে চিত্রকলা। গুহাযুগ থেকে ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক বা নিছক কৌতুহল বশত মানুষ আঁকতে শুরু করে ছবি। এর ভাষা সার্বজনীন হওয়ার এই শিল্পের আবেদনও ব্যাপক। এর ব্যাপকতার জন্য বিভিন্ন সময় পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে নানা প্রতিবন্ধকার স্বীকার হয়েছে এই শিল্প মাধ্যম। সৃষ্টি করা হয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। তবুও চিত্রকলা এগিয়েছে আপন গতিতে। যখনি এর গতিকে রোধ করার চেষ্টা করা হয়েছে সে তার আঙ্গিক পরিবর্তন করে আরো তীব্র গতিতে এগিয়েছে। নানা ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে বিশ্বে চিত্রকলা তার ধারা অব্যাহত রেখেছে আজো।

ঢাকার আদি চিত্রশিল্পীদের সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা যায় না। তবে ঢাকায় চিত্রশিল্পী ছিল না তা বলা যাবে না কারণ। এ অঞ্চলে গড়ে ওঠে অনেকগুলো পেশার সাথেই ছিল নকশা ও চিত্রশিল্পের সম্পর্ক। এরমধ্যে উল্লেখ করা যেতে পারে মসলিন, জামদানি, কাসিদা, নকশিকাঁথা, শাঁখা, শঙ্খ, শোলা শিল্প, ফিলিগ্রি, স্বর্ণ বা রৌপ শিল্প প্রভৃতি। এর সবগুলোতেই রয়েছে নকশা শিল্পের নিগূঢ় সম্পর্ক। তাই ঢাকায় আদিতে চিত্র শিল্পী ছিল না এ কথা ভাববার কোন অবকাশ নেই। তবে তাদের কথা আলাদা করে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি।

ঢাকার আদি চিত্রশিল্প বা চিত্রশিল্পীর কোনরূপ তথ্য না পাওয়া গেলেও ইংরেজ শাসনমলে ঢাকায় আগত বা ঢাকাস্থ কয়েকজন চিত্রশিল্পী সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণা পাওয়া যায়। অবশ্য ১৯৪৭ সালের কাছাকাছি সময় থেকে আধুনিক চিত্রশিল্পীদের আগমন ঘটে ঢাকাতে ১৯৪৮ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করা হয় ঢাকা আর্ট কলেজ। যেহেতু আমাদের আলোচনা ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তাই এই তথ্যগুলো এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে না।

একত্রিত ভাবে না পাওয়া গেলেও বিচ্ছিন্নভাবে টুকরো টুকরো করে ঢাকার চিত্রশিল্পীদের সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা যায়। ঢাকার মোগল নায়েব নাজিম নুসরাত জঙ ছিলেন শিল্পরসিক। তিনি ছিলেন প্রাশ্চাত্য শিল্পকলার ভক্ত। তার প্রাসাদের দরবার কক্ষের দেয়ালগুলোতে প্রাচ্যরীতিতে সাজানো পাশ্চত্যের আধুনিক চিত্রকর্ম দেখতে পান ঢাকার তৎকালীন কালেক্টর ও চিত্রশিল্পী চার্লস ডয়লী। নুসরাত জঙের উদ্যোগেই শিল্পী আলম মুসাওয়ার ঢাকার ঈদ ও মুহরমের মিছিলের ছবি আকেন।

পলাশি পরবর্তী বাংলার নায়েব নাজিম শামস্-উদ-দৌলাহর (১৭৭০-১৮৩১) বাড়িতে ১৮২৪ সালে পরিব্রাজক বিশপ হেবার ইউরোপীয় ব্যক্তিদের বিশাল বিশাল চিত্রকর্ম দেখতে পান। এগুলো ছিল মূল ছবির উন্নতমানের প্রিন্ট।

এছাড়া ঢাকার আরমানিয় গির্জায় অভ্যন্তরে রয়েছে বেশ পুরনো একটি তৈল চিত্র। ধারণা করা হয়, চিত্রকর্মটি পোগোজ স্কুলের একসময়কার প্রধান শিক্ষক চালর্স পোটের আঁকা। সম্ভবত চালর্স পোট ছিলেন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান। তবে সে সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না।

১৮৪৪-৪৫ সালের দিকে ঢাকার খাজা পরিবারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা খাজা আলীমুল্লাহ ইংরেজদের খুশি করার জন্য রমনায় চালু করেন রেসকোর্স। এ সময় অজ্ঞাতনামা এক শিল্পী রমনা রেসের একটি ছবি আঁকেন। এ চিত্রকর্মটিতে খাজা আলীমুল্লাহ, আবদুল গণি ও কয়েকজন ইংরেজের ছবি রয়েছে। ঢাকার নবাব খাজা আহসানুল্লাহ ১৮৮০ সালের দিকে কলকাতা থেকে উইলস নামে এক শিল্পীকে আহসান মঞ্জিলের সামিয়ানা চিত্রিত করণের জন্য ঢাকায় আনেন বলে জানা যায়।

বিভিন্ন সূত্র থেকে ঢাকায় আগত বা স্থানীয় যে কয়জন চিত্রশিল্পীর নাম জানা যায়। তারা হচ্ছেন- চার্লস ডয়লী, আলম মুসাব্বীর/আলম মুসাওয়ার, ফ্রানসেসকো রেনালডি, রমেশ দাস, ফটিকচন্দ্র নন্দী, নঈম মিঞা, কৈলাশ আচার্য, জিতেন গোঁসাই প্রমুখ। এছাড়াও অমলেন্দু বসুর কথায় জানা যায় ঢাকার ফরাশগঞ্জে সাধারণ চিত্রকর ব্রজগোপাল ও কামাখ্যা বসাকের নাম।

মূর্শেদূল মেরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

twelve − 5 =

এই শহর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে তথ্য-উপাত্ত্য সংগ্রহ করেছি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তা নিয়ে কিছু একটা করবার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরেই। নানা…

error: Content is protected !!