ঢাকেশ্বরী মন্দির

মন্দির : ঢাকার প্রথম মন্দির সম্ভবত বকশিবাজারস্থ ঢাকেশ্বরী মন্দির। অনেকে ধারণা করেন এই মন্দিরের নাম থেকেই ঢাকা শহরের নামকরণ হয়েছে ‘ঢাকা’।

মসজিদ : ঢাকার প্রথম মসজিদ নারিন্দাস্থ বিনত বিবির মসজিদ। মসজিদটি ১৪৫৬/১৪৫৭ সালে নির্মিত।

মুসলিম শিলালিপি : এ যাবৎ প্রাপ্ত তথ্য মতে, ঢাকার নারিন্দাস্থ বিনত বিবির মসজিদের গায়ে লাগান শিলালিপিটিই ঢাকার প্রথম মুসলিম শিলালিপি।

গির্জা : পর্যটক তাভারনিয়ার ও মানরিকের বর্ণনায় ঢাকায় একটি গির্জার উল্লেখ পাওয়া যায়। এই গির্জাটি ১৬১২ সালের দিকে অগাসটিয়ানদের দ্বারা নির্মিত বলে জানা গেলেও ঢাকায় এর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। 

ইমামবাড়া : ঢাকায় বেশ কয়েকটি প্রাচীন ইমামবাড়ার কথা জানা যায়। কয়েকটির শুধু নাম উদ্ধার করা গেলেও সেগুলো সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানা যায় না। তাই ঢাকা শহরের প্রথম ইমামবাড়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। তবে আজিম-উশ-শানের মতে, ঢাকার সবচেয়ে পুরান ইমামবাড়া ফরাশগঞ্জের বিবি কা রওজা। জনৈক আমীর খান এই ইমামবাড়াটি নির্মাণ করেন ১৬০০ সালে। অনেকে অবশ্য বিবি কা রওজাকে ইমামবাড়া মানতে নারাজ।

গুরুদুয়ারা : কথিত আছে, দিল্লির মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে (১৬০৫-১৬২৬), সতের শতকের গোড়ার দিকে শিখদের ষষ্ঠ গুরু আলমাস্ট নামক জনৈক শিখ গুরুকে পাঠান ঢাকায়। তিনিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠাগারের পশ্চিম পার্শ্বে আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের দেয়াল ঘেঁষে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে সুজাতপুরের শিখ সঙ্গত নামে একটি শিখ মন্দির স্থাপন করেন। বর্তমানে এটি গুরুদুয়ারা নানক শাহী নামে অধিক পরিচিত। 

ব্রাহ্ম সমাজ মন্দির : ঢাকার ব্রাহ্ম সমাজ সদরঘাটের পার্শ্বে পাটুয়াটুলির মুখে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল সংলগ্ন ভূমিতে ব্রাহ্ম সমাজ মন্দির নির্মাণ করে। ২২ আগস্ট ১৮৬৯ সাল/৭ ভাদ্র ১২৭৬ সালে ব্রাহ্ম মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

বিদ্যালয় : ১৮১৫ সালের দিকে দরিদ্র ইউরোপিয়ান ও ইউরেশিয়ানদের সন্তানদের শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে কলকাতা বেনেভোলেন্ট ইনস্টিটিউশন এর একটি শাখা ঢাকা খোলার জন্য আয়রল্যান্ডের অধিবাসী রেখারেন্ড ওয়েন লিওনার্দোকে ঢাকায় পাঠানো হয়। শ্রীরামপুরের মিশনারিদের উদ্যোগে সে সময় বেশ কিছু বেনিভোলেন্ট ইনস্টিটিউশন বা দাতব্য সংস্থা ছিল। যার একটি শাখা খোলার জন্য তাকে ঢাকাতে পাঠান হয়।

লিওনার্দো এপ্রিল ১৮১৬ সালে একক প্রচেষ্টায় ঢাকায় তার বাড়ির নীচ তলায় অর্থাৎ ‘ছোট কাটরা’য় ঢাকার প্রথম স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন ; যা প্রধানত খ্রিস্টান শিশুদের জন্য খোলা হয়। প্রথম বছরে গ্রিক ও আরমানিয় সহ মোট ৩৯ জন শিক্ষার্থী নিয়ে স্কুলটি যাত্রা শুরু করে। স্কুলটিতে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি, ব্যাকরণ, গণিত, বাইবেল, ধর্মীয় সংগীত ও প্রশ্নত্তোরের মাধ্যমে বিশেষ পদ্ধতিতে খ্রিস্ট ধর্ম শিক্ষা প্রদান করা হত। 

লিউনার্দো কোম্পানির চাকরি নিয়ে ভারতে আসেন ১৭৮৭ সালে। উইলিয়াম কেরির প্রভাবে তিনি ১৮১০ সালে কলকাতার লালবাজার গির্জায় ব্যাপটিস্ট মতবাদে দীক্ষিত হন। লিউনার্দো সেসময় সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করে ব্যাপটিস্ট মণ্ডলীর হয়ে প্রচার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। প্রথমে তিনি নারায়ণগঞ্জের দিকে স্কুল খুলতে চাইলেও সহায়তা না পাওয়ায় তাকে নিজ বাড়িতেই স্কুল খুলতে হয়। দু’বছরের মাধ্যেই তার প্রতিষ্ঠিত স্কুলের সংখ্যা দাঁড়ায় ছয়টিতে। এরমধ্যে পাঁচটিতে শিক্ষা দেয়া হত বাংলায় আর একটিতে উর্দুতে। জানা যায়, ১৮১৭ সালে মুসলমান শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে লিওনাদো ঢাকায় একটি ফারসি স্কুলও খোলেন। এসব স্কুলে মূলত খ্রিস্টধর্ম বিষয়েই শিক্ষাদান করা হত। 

তিনি একটানা ১৮১৫-৪৮ সাল পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করেন। অপর তথ্য মতে, ১৮৪৮ সালে লিওনার্দোর মৃত্যুর পরে ছোট কাটরার স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। মহিলা শিক্ষক তৈরি করার উদ্দেশ্যে একটি নর্ম্যাল স্কুল অর্থাৎ শিক্ষিকা প্রশিক্ষণ স্কুল খোলার জন্য সচেতন ঢাকাবাসীরা বারবার সরকারের কাছে আবেদন-নিবেদন করেন। ১৮৬৩ সালে ঢাকায় একটি মহিলা নর্মাল স্কুল খোলা হয়। অবশ্য এই স্কুলটি কয়েক বছর পরেই বন্ধ হয়ে যায়।

রকারি বিদ্যালয় : ঢাকার সিভিল সার্জন জেমস টেইলর ভারত ঢাকায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা সরকারের জেনারেল কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশনকে অবগত করেন। সেজন্যে ঢাকাবাসী প্রয়োজনীয় আর্থ যোগান দিতেও ছিল প্রস্তুত। ২৫ জুন ১৮৩৫ সালে ভারত সরকার তার এই প্রস্তাব অনুমোদন করে।

সরকার স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য ঢাকায় শিক্ষক মি রিজ ও বাবু পার্বতী চরণকে প্রেরণ করে। ১৫ জুলাই ১৯৩৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পুরনো বাণিজ্য কুঠিটি ভাড়া নিয়ে যাত্রা শুরু করে ঢাকা গবর্নমেন্ট স্কুল। জানা যায়, স্কুলটি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ঢাকার অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও সহায়তা করে। পরবর্তীতে এই স্কুলটিই পরিচিতি পায় সরকারি কলেজিয়েট স্কুল নামে।

বালিকা বিদ্যালয়/ফিমেল নর্মাল স্কুল : ১৮৭৩ সালে ফরাশগঞ্জে একটি বাড়িতে ব্রাহ্মসমাজের উদ্দ্যোগে প্রতিষ্ঠা পায় ঢাকার প্রথম বালিকা বিদ্যালয়। জানা যায়, প্রথমাবস্থায় মাত্র দুজন শিক্ষার্থী নিয়ে বিদ্যালয়টি যাত্রা শুরু করে। ঢাকার ‘শুভসাধিনী সভা’ নামে একটি সমাজসেবামূলক সংগঠন এই বিদ্যালয় স্থাপন করে। অবশ্য পরবর্তী ১৮৭৮ সালে আরেকটি বালিকা বিদ্যালয়ের সঙ্গে এটি একীভূত হয়ে স্কুলটির নামকরণ করা হয় ঢাকা ফিমেল স্কুল।

বেসরকারি বিদ্যালয় : সম্ভবত ঢাকার আরমানিয় নাগরিক নিকি পোগোজের নামে প্রতিষ্ঠিত পোগোজ স্কুলটিই ঢাকার প্রথম বেসরকারি বিদ্যালয়।

কারিগরি বিদ্যালয়/টেকনিক্যাল স্কুল : এ যাবৎ প্রাপ্ত তথ্য মতে, ১৮৭৬ সালে ঢাকায় প্রথম সার্ভে স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমাবস্থায় এই স্কুলে শিক্ষার্থীরা দু’বছর শিক্ষাক্রম শেষে সার্ভেয়ার, কানুনগো বা আমিনের জন্য পরীক্ষা দেয়ার যোগ্যতা অর্জন করত। পরবর্তীতে এই কোর্সটি ৩ বছরে মেয়াদী করা হয়। তবে ১৮৯৭ সালে গর্ভনমেন্ট এই নিয়ম পরিবর্তন করে ও ১৮৯৮ সালে স্কুলটির সংস্কারের পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৯০১ সালে স্কুলটিকে একটি প্রকৃত ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে রূপান্তরিত করা হয়।  বর্তমানে এটিই ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত।

সরকারি কলেজ : ঢাকার প্রথম সরকারি কলেজ ঢাকা কলেজ।

বেসরকারি কলেজ : ঢাকার প্রথম বেসরকারি কলেজ জগন্নাথ কলেজ।

মেডিকেল কলেজ : ঢাকার প্রথম মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল কলেজ।

মাদ্রাসা/মক্তব : ঢাকা শহরে অনেক মসজিদের সঙ্গেই ছিল মক্তব ও মাদ্রাসা। তবে ঢাকায় সরকার কর্তৃক স্বীকৃত মাদ্রাসা হিসেবে ঢাকা মাদ্রাসাই সম্ভবত প্রথম মাদ্রাসা।

মূর্শেদূল মেরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

four × two =

এই শহর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে তথ্য-উপাত্ত্য সংগ্রহ করেছি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তা নিয়ে কিছু একটা করবার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরেই। নানা…

error: Content is protected !!