মহরম

মহরমের শাব্দিক অর্থ সম্মানিত, মর্যাদাবান, নিষিদ্ধ, হারাম ইত্যাদি। মুসলমান সম্প্রদায়ের শিয়া মতালম্বীদের সর্ববৃহৎ উৎসব মহরম। শিয়া সম্প্রদায়ের লোকরা হিজরি বর্ষের প্রথম মহরম মাসে এই উৎসব পালন করে থাকে। আরবি বর্ষ ও হিসাব গণনার প্রথম মাস মহরম। 

জানা যায়, ইমামতন্ত্রে বিশ্বাসী শিয়া মতবাদের উদ্ভব মধ্য প্রাচ্যের দেশ ইরাক-ইরানে। ইরাকের কারবালা প্রান্তরে উম্যায়্যা ৬৮০ সালে উম্যায়্যা খলিফা মুআবিয়ার পুত্র ইয়াজীদের সৈন্যরা নির্মমভাবে হত্যা করে হযরত মুহাম্মদ (স) এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনকে। শত শত বছর পূর্বে ইরাকের কারবালা প্রান্তরে ঘটে যাওয়া সেই হৃদয়বিদারী ঘটনার অনুশোচনা প্রকাশের জন্য শিয়ারা প্রতিবছর পালন করে আসছে এই উৎসব। 

ইতিহাসবিদরা ধারণা করেন, শিয়া মতবাদ গড়ে ওঠার সময় ইরানে এ্যাডোনিস তামুজ/এ্যাডোমিম অজুদ পুজার প্রচলন ছিল। জানা যায়, প্রবল তাপে পানি না পেয়ে মৃত্যু হয় এ্যাডোনিস তামুজ দেবতার। সেকারণে তামুজের অনুসারীরা প্রতিবছর এই দেবতার তাজিয়া বা কৃত্রিম শব নিয়ে বিলাপমূলক শোক মিছিল বের করত। সম্ভবত তাদের দেখাদেখিই শিয়া মতালম্বীরা মহরমের শোক মিছিলের প্রচলন করে আসছে।

ইরাকের কারবালায় হোসেনের বিয়োগান্তর ঘটনার পূর্বে আবর দেশগুলোতে এ দিনটিকে আনন্দোৎসবের মধ্য দিয়ে পালন করা হত। আরব দেশে পূর্ব থেকেই এই দিনটি ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনেই হযরত মূসা/মৌজেস [ইহুদী ধর্মের প্রবর্তক] ও তার জাতি অত্যাচারি ফেরাউন রাজবংশের কাছ থেকে মুক্তিলাভ করে। বছরের এই দিনেই ইসলাম ধর্মের আরেক নবী নূহ (আ) এর সময় এক ভয়ঙ্কর প্লাবনে বির্স্তীণ এলাকা প্লাবিত হয় ; নূহ বেশকিছু মানুষ ও পশুপাখি নিয়ে বিশাল এক নৌকায় ওঠে। এই আশুরার দিনেই তিনি নৌকার সকল যাত্রী ও পশুপাখি নিয়ে নিরাপদে স্থলভাগে অবতরণ করেন। এ দুটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই মাসকে পবিত্র মাস মানা হত বহু পূর্বকাল থেকেই। 

প্রকৃতগত কারণেই আরবরা ছিল যুদ্ধবাজ জাতি। কিন্তু তারা ইসলামপূর্ব যুগেও এই পবিত্র মাসে যুদ্ধ বন্ধ রাখত। তবে এ কথাও প্রচলিত আছে যে, তারা এতটাই যুদ্ধ প্রিয় ছিল যে যুদ্ধ চলাকালীন সময় মহরম মাস এসে পড়লে তারা উভয়পক্ষ বৈঠকে বসে সমঝোতার মাধ্যমে এই পবিত্র মাসকে কয়েক মাস পিছিয়ে দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেত।

ধারণা করা হয়, বিদেশী শাসক ও বণিকদের হাত ধরেই মহরমের মিছিলের জৌলুস পায় শহর ঢাকায়। ঢাকায় মহরম উৎসব পালনের প্রাণ ছিল কৃত্রিম শবযান যোগে মিছিল ও মাতম। ঢাকার মোগল শাসক নায়েব-নাজিমরাও এই মিছিলে যোদ দিতেন। মহরমের ব্যয় নির্বাহের জন্য বরাদ্ধ থাকত সরকারি কোষাগার থেকে। অবশ্য ইংরেজ শাসনামলে এই অর্থ ছাড় রহিত করা হয়।

মোগল শাসনামলে শিয়া সম্প্রদায়ের বেশ আধিপত্য ছিল ঢাকাতে। মহরম উৎসব প্রচলনকাল সম্পর্কে সুস্পষ্ট প্রমাণাদি না পাওয়া গেলেও প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে ধারণা করা হয়, মোগল শাসনামলে সতের শতকে ঢাকাতে এই উৎসবের প্রচলন ঘটে। সম্ভবত ইরান থেকে আগত শিয়ারাই এর প্রবর্তক। মোগল সুবেদার শাহ সুজার শাসনামলে (১৬৩৯-৫৯) পারস্য/ইরান থেকে বহু শিয়া পরিবার বাংলায় আসে ভাগ্যান্বেষণে। ঢাকায় এই উৎসব পালনের প্রধান অঙ্গ ছিল এর মিছিল এবং এই উৎসব পালনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকার ইমামবাড়া হোসেনী দালান। 

আরবি বছরের মহরম মাসের দশ তারিখকে বলা হয় আশুরা। মহরম মাসের দশম দিনে ঢাকার হোসেনী দালান থেকে তাজিয়া মিছিল বের হয়ে তা ধানমণ্ডির কৃত্রিম কারবালায় যেয়ে শেষ হত। এই দিনেই ইমাম হোসেন শাহাদাত বরণ করেন। ইরানে এ উৎসবের জন্ম হলেও ঢাকাতে এ উৎসব পালনে দেখা যায় খানিকটা ভিন্নতা। ইরানে মহরমের মিছিলে তাজিয়া/কৃত্রিম শবযান ব্যবহার করা হয় একটি (শুধুমাত্র কারবালা প্রান্তরে নিহত হযরত (স) এর জামাতা হযরত আলীর পুত্র হোসেনের) অন্যদিকে ঢাকার মিছিলে দেখা যায় দুটি কৃত্রিম শবযান তৈরি করা হয়। ঢাকার মহরম মিছিলে হযরত আলীর দুই পুত্র- ইমাম হাসান ও হোসেনের কৃত্রিম শবাদার নির্মাণ করা হয়।

অনেকে মনে করেন, সে সময় ঢাকার মুসলমানরা মনে করত এই দিন হযরত আলীর দুই পুত্রই শহীদ হন। প্রকৃত অর্থে ইমাম হাসানকে ৬৭০ সালে মদীনায় বিষপান করিয়ে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে এই ঘটনার ১০ বছর পরে অর্থাৎ ৬৮০ সালে ইমাম হোসেনকে কারবালার প্রান্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, যার প্রেক্ষিতে এই মহরম উৎসব পালন হয়ে আসছে। 

সমগ্র মুসলমান সম্প্রদায়ের কাছে মহররম মাস বিশেষ মাস হিসেবে পালিত হলেও শিয়াদের কাছে এই মাস শোকের মাস। তারা এ মাসের অন্তত প্রথম দশদিন সকল আনন্দ-উৎসব এমনকি বিবাহ-সাদী থেকেও বিরত থাকে। অনেকে শোকের প্রতীক হিসেবে পুরো মাস জুড়ে কালো পোষাক পরিধান করে। কারবালার সেই মর্মান্তিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে খ্যাতিমান সাহিত্যিক মীর মোশাররফ হোসেনের রচিত বিষাদ-সিন্ধু উপন্যাসটি ১৮৮৫-৯১ সালে প্রকাশিত হলে ঢাকায় মহরম উৎসবটি লাভ করে নতুন মাত্রা। 

এযাবৎকাল প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকায় মহরম পালনের চিত্র- মহরমের চাঁদ দেখার পরই শুরু হত এই উৎসব। ঢাকায় এ উৎসবের প্রধান আকর্ষণ ছিল মিছিল ও মেলা। নায়েব নাজিম শাসনামলে ঢাকা শহরের নবাবগঞ্জ, মির্জ্জা মান্নার দেউড়ি, উর্দু রোড, গোড়ে শহীদ, বংশাল, জিন্দাবাহার প্রভৃতি এলাকায় মহরম মাসের শুরুতেই আখড়া স্থাপন করা হত। এখান থেকেই মহরমের মিছিলের বিভিন্ন আয়োজন করা হত। বর্শা, তরবারি, ঢোল, লাঠি ইত্যাদি বানিয়ে মহরমের মিছিলের প্রস্তুতি নেয়া হত। 

মহরম মাসের প্রথম ১০ দিন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই উৎসবের তৃতীয় রাতে ঢাকার হোসেনী দালানের প্রাচীরে জ্বালান হত অসংখ্য মোমবাতি। আলোয় ঝলমল করে উঠতো চারপাশ। আজকের মতো চারপাশে ঘনবসতি ছিল না বলে অনেকদূর থেকে সেই নিশান আর আলোকসজ্জা দেখা যেতো।

চতুর্থ দিনে ভাটিয়ালি মর্সিয়া (ভাটিয়ালির সুরে শোকগাথা) গানের জন্য ২০টি মহল্লাকে ‘হাদি’ ও ‘গিরওয়া’ নামে দুই ভাগে ভাগ করে পালাগানের আয়োজন করা হত। একপক্ষ গান করে প্রশ্ন করত, অন্যপক্ষ গানের মাধ্যমে উক্ত গানের উত্তর দিত। প্রত্যেক দলের সামনে থাকত ‘অরণি’ নামে পরিচিত নিশান। এতে ইমাম হোসেনের শাহাদাত বরণের ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বর্ণনা করা হত।

পঞ্চম দিনে সুন্নী সম্প্রদায়ের ভিস্তিরা সবুজ লুঙ্গী, সবুজ শার্ট, মাথায় পাগড়ি, গলায় কাফনী (কাফনের কাপড়) কব্জিতে ও গলায় সোনালী তাগা পড়ে এক হাতে পানির গ্লাস-সঙ্গে পানির পাত্র এবং অন্য হাতে চিত্রিত লাঠি ও খালি পায়ে মিছিল বের করত ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায়। 

ষষ্ঠ দিনে ভিস্তিরা হোসেনী দালানে যেয়ে নিজ নিজ লাঠিগুলো কাঁচির মত করে সাজিয়ে রাখত, লাঠির নীচে জ্বালতো মোমবাতি। হাজার হাজার মানুষকে নিয়াজ বা সিন্নি বিলান হত এই দিন। এই দিনে হোসেন ও ইয়াজীদ বাহিনীর কারবালার যুদ্ধের স্মরণে লাঠিখেলাও প্রদর্শন করা হত।

ষষ্ঠ ও সপ্তম দিনে ঢাকায় আতশবাজী জ্বালানো ছিল বাড়তি আনন্দ। সপ্তম দিনে ছিল জলুস বা মিছিল। ঐদিন হোসেনী দালান সাজান হত আলোয় আলোয়। এই দিনের অন্যতম বৈশিষ্ট ছিল মনবাসনা পূর্তির জন্য মানত করা, যা এখনো অব্যাহত আছে। মানত পূরণে অনেকেই শিরনী বিতরণ করত এই সপ্তম দিনে। শিরনীর সঙ্গে কেউ কেউ রূপার তৈরি পাঞ্জাও ইমামবাড়ায় উপহার দিত। এই বিশেষ পাঞ্জা ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হযরত মুহম্মদ, উনার কন্যা ফাতিমা, তার জামাতা আলী এবং তুই দৌহিত্র হাসান-হোসেনকে একত্রে বোঝায়।

অষ্টম দিন অপরাহ্নে ঢাকার আশপাশের গ্রাম থেকে মহিলারা দুপহরিয়া মাতম বা জারি গান গাইতে আসত ; সে সময় পুরুষদের হোসেনী দালানের অভ্যন্তর থেকে অন্যত্র চলে যেতে হতো। হোসেনী দালান থেকে বিকালে বের হত ‘তুগগাস্ত’ নামক মিছিল। এই মিছিল বকশীবাজার, উর্দু রোড, বেগমবাজার, দেওয়ান বাজার হয়ে চকে গিয়ে শেষ হত। মিছিলের সম্মুখে থাকত পতাকাবাহী আখড়ার সদস্যরা, এরপর নিশান নিয়ে হাতি, হাতির পরে ঘোড়া, তারপর লাঠিয়াল (এরা লাঠি ঘুড়াতে ঘুড়াতে ও তরবারি চালাতে চালাতে এগিয়ে চলত), তারপরে গানের দল। গানের দলের মধ্যে প্রথমে মহল্লার কোন এক দল থাকত যারা শোকের সুর বাজাত। এরপর ঘোড়ার পিঠে ‘নহবৎ’, তারপর বাদকদল, শেষ দিকে একটি ডংকা। ডংকার পর জোড়া জোড়া ‘বিবি কা দোলা’ বা ‘পালকি’। আদিতে এই সমস্ত দোলাগুলো নেয়া হত উটের পিঠে করে। এই পালকিগুলো মোড়া থাকত কালো কাপড় দিয়ে। পালকির সঙ্গে পয়সা বিলাবার জন্য থাকত নির্দিষ্ট লোক। দোলার দু’দিকে সরদারদের নেতৃত্বে মাঝে মাঝে শ্লোগান দিতে দিতে যেত ভিস্তির দল- 

“একনারা, দোনারা, বোলো বোলো ভেস্তা”

তখনো ঢাকায় সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেনি এ শহরে; মহরমের সময় ঢাকার হিন্দু সম্প্রদায় ও মুসলমানদের সুন্নী ও অন্যান্য দলও ভিস্তির ভূমিকায় অবর্তীণ হত। প্রাচীনকাল থেকেই ঢাকার মহরমের এই ১০ দিন ভিস্তিরা নিজেদের মাঝে সাময়িক পঞ্চায়েত গঠন করত। সেই পঞ্চায়েতের নির্বাচিত প্রধান সরদারকে বলা হত ‘নবাব ভেস্তা’। পঞ্চায়েতের মাধ্যমে এই ভিস্তিরা নিয়মতান্ত্রিক ভাবে মিছিল যোগ দেয়া এবং আগত দর্শনার্থীদের পানি পান করার কাজটি সম্পন্ন করত। কারবালার প্রান্তরে এই মাসেই ইমাম হোসেন ও তার অনুসারীদের পানির কষ্ট দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। তাই তাদের স্মরণে ও সম্মানার্থে এই পানি পানের বিশেষ রীতি প্রচলিত।

দোলার পর থাকত হোসেনের আহত ঘোড়া অনুকরণে ‘দুলদুল’ ঘোড়া। দুলদুলকে নিয়ে বের হত কালো অথবা সবুজ পোশাক পরা শোকাহত জনতার মিছিল। পশ্চাতে কালো কাপড় পরিহিত মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা আরব্য ভাষায় শোকের গান গাইতে গাইতে এবং বুকে করাঘাত করতে করতে এগিয়ে চলল। সবশেষে থাকত একটি হাতি বা দুজন ঢোল বাদক। এই মিছিলে মাতমের সঙ্গে বুক চাপড়ানো ও জিঞ্জির দিয়ে পিঠের ওপর আঘাত করে রক্তাক্ত করা হত।

নবম দিনে বিকালে পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জের ইমামবাড়া বিবি কা রওজা থেকে ‘তুগ-গাস্ত’ নামের একটি মিছিল বের হত। এ মিছিলটি ‘বিবি কা রওজা’ থেকে ঢাকার নানা রাস্তা ঘুড়ে বিভিন্ন রকম কলাকৌশল প্রদর্শন করে চকবাজার ঘুরে মধ্যরাতে যেত হোসেনী দালানে।

দশম দিন অর্থাৎ আশুরার দিনে আজিমপুরে বসত বিরাট মেলা। এই দিনে ঢাকার অন্যান্য ইমামবাড়া থেকে তাজিয়া বা হযরত মুহম্মদ (স) এর দৌহিত্রের কৃত্রিম শবযান নিয়ে মিছিল করে সবাই আসত আজিমপুরের কাছে হাসনাবাদে কল্পিত কারবালায়। সেখানে তাজিয়াগুলো বিসর্জন দেয়া হলেও অন্যান্য প্রতীক কবরগুলো কালো কাপড়ে মুড়ে নিঃশব্দে নিয়ে আসা হত হোসেনী দালানে। 

মহরমের আশুরার এই মিছিল চলাকালীন সময় বেগমবাজার থেকে হোসেনী দালান পর্যন্ত রাস্তার দুপার্শ্বে অসংখ্য দরিদ্র ও বিকলাঙ্গ মানুষরা কাপড় বিছিয়ে বসে থাকত চাল-কড়ি-পয়সার আসায়। হোসেনী দালানের প্রাচীরের কোন কোন স্থানে কালো কাপড়ে ঢেকে দেয়া হত বা মসী দিয়ে রঙ্গিন করা হত। মহরম মাসের এই প্রথম ১০ দিনের জন্য হোসেনী দালানের চারিদিকে দিন-রাত্রি ২৪ ঘণ্টার জন্য বাজার বসত।

পরবর্তীতে এই মিছিল হোসেনী দালান থেকে আরম্ভ হয়ে ঢাকার বিভিন্ন পথ ঘুরে হাসনাবাদের পরিবর্তে ধানমন্ডি লেকের পাড়ে কৃত্রিম কারবালায় এসে শেষ হত।

লক্ষ্য পূরণের আশায় মহরম মাসের আশুরাতে তাজিয়া মিছিল চলাকালে মহিলারা ঘোড়া, ‘জুলজানা’র সামনের পা দুটি একপাত্র মধু দিয়ে ধুয়ে দিত এবং জুলজানাকে হালুয়া জাতীয় খাবার দিয়ে পা ধোয়ানর পর যে দুধটুকু থাকত তা বাসায় নিয়ে বন্ধ্যা নারীর সন্তান ধারণ ও কঠিন রোগ ব্যাধিতে রুগিকে এই দুধ পান করান হত বলে জানা যায়।

আদিতে ঢাকায় নবী দৌহিত হোসেনের কল্পিত সমাধি ‘তাজিয়া’ সাধারণত কাঠ, কাগজ, সোনা, রূপা, মারবেল পাথর ইত্যাদি দিয়ে তৈরি করা হত। পরবর্তীতে ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহ ঢাকার হোসেনী দালানের কাঠ ও রূপার আবরণ দিয়ে নির্মিত একটি তাজিয়া উপহার দেন। খাজা সলিমুল্লাহর প্রদান করা এই তাজিয়াটি বিশেষ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে প্রতিবার আশুরার দিন মিছিলে বের করা হত এবং নিরাপদে তা আবার ফিরিয়ে আনা হত হোসেনী দালানে।

ঢাকার সিভিল সার্জন জেমস টেলরের বিবরণীতে ঢাকার মহররম- “মহরমের অনুষ্টানাদি হোসনী দালানে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। আশুরা বা প্রথম ১০ দিন রোজার প্রাক্কালে এর অভ্যন্তরভাগ কৃত্রিম পুষ্পরাজি, স্বচ্ছ দ্রব্যাদি- বিশেষত বস্ত্র, উটপাখির ডিম ইত্যাদি দিয়ে সাজান হয়ে থাকে। ইমাম হাসান ও হোসেনের প্রতিকৃতি সংরতি স্থানের ঠিক ওপরে দেয়ালগুলোতে কাল বস্ত্রের লাইন টানা থাকে। করে কেন্দ্রস্থলে একটি ঝরনা রয়েছে এবং রাতে যখন এ কাজের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একদল গায়ক কর্তৃক মর্শিয়া খানি বা মৃতের জন্য শোকগীতি ও উচ্চ প্রশংসাবাণী গীত হয় তখন সমগ্র কটি প্রচুর প্রদীপ ও রঙিন মোমবাতির আলোকে আলোকিত করা হয়। 

এরা সারাটা রমজান মাসব্যাপী তাদের সর-বেদারী (রাত্রিকালীন জাগরণ) অভ্যাহত রাখে। প্রার্থনার ৭ম দিনে পুষ্পরাজি ও জড়িদার বস্ত্রে সজ্জিত কাষ্ঠদাণ্ডের ওপর স্থাপিত একখানি খোলা হাতের প্রতিকৃতি নিয়ে গান-বাদ্যসহকারে রাস্তা প্রদক্ষিণ করা হয়। রোজার ১০ম দিনে তবিয়ত বা এ ২ জন শহীদের প্রতিকৃতি বিরাট জাঁকজমক ও উৎসবহকারে শহরের নিকটবর্তী একটি স্থানে বহন করে নেয় এবং সেখানে প্রতিকৃতি সমাধিস্থ করে। 

এই উৎসবের সময় লাল ও সবুজ বস্ত্রে সজ্জিত বালকগণ পানি বা শরবত পরিপূর্ণ চর্মনির্মিত থলে ও পতাকা বহন করে ও শহরের এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। এরা পথাযাত্রীদের সরবত ও পানীয় বিলায়।”

চিত্রশিল্পী আমিনুল ইসলাম তার বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের পঞ্চাশ বছর গ্রন্থে ঢাকার স্মৃতিচারণে বলেছেন- “ঢাকায় এসে (১৯৩৬ সাল) উঠেছিলাম আরমানিটোলা হাইস্কুলের ঠিক উত্তর দিকে, অধুনা বিখ্যাত তারা মসজিদের উল্টোদিকে। পাশেই ছিল মাহুতটুলী ফ্রি প্রাইমারি স্কুল। ওখানেই আমাকে শিশুশ্রেণিতে ভর্তি করে দেওয়া হয়, ঢাকা আসার সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই। ঐ সময়টা ছিল মহররমের মাস। বাসার সামনে দিয়ে প্রায়ই ছোট ছোট মিছিল যেত অনেক ধরনের পতাকা নিয়ে। আমি একদিন বিকেলে ঐ মিছিলের পেছনে পেছনে গিয়ে হোসেনি দালান চলে যাই। সন্ধ্যার কিছু আগে, অনেক লোকজনের ভিড়ে হারিয়ে ফেলি আমার দলটিকে। চিন্তায় পড়ে গেলাম বাড়ি ফিরব কীভাবে- রাস্তা-ঘাট কিছুই চিনি না, বাড়ির ঠিকানা জানি শুধু আরমানিটোলা স্কুলের কাছে। এদিকে রাত হয়ে গেছে, হোসেনি দালানের গেটের কাছে দাঁড়িয়েছিলাম কাঁদ কাঁদ মুখে। অবশেষে এক ঘোড়ার গাড়ির গাড়োয়ানের সহায়তায় রক্ষা পাই। তার গাড়ির পেছনে বসিয়ে আমাকে এসে নামিয়ে দেয় বাড়ির কাছাকাছি এক জায়গায়।”

ঢাকার এই মহরম মিছিলটিও পেয়েছিল সর্বজনীনতা। শহর ও শহরতলী প্রায় সকল সম্প্রদায়ের লোকরাই এ মিছিলে উপস্থিত থাকত। সকলে মিছিলে অংশগ্রহণ না করলেও দর্শক হিসেবে উপস্থিত থাকত। প্রায় সকল ধর্মের লোকরাই মানত করতে ; আশা পূর্ণ হলে সিন্নি বিলাত। পূর্ব জৌলুষ কিছুটা কমলেও বর্তমানেও মিছিলটি অব্যাহত রয়েছে।

[তাজিয়া : ইমাম হোসেনের সমাধির প্রতিকৃতি। আরবি ‘তাজিয়া’ শব্দটির অর্থ শোক ও সমবেদনা।]

মূর্শেদূল মেরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

five × three =

এই শহর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে তথ্য-উপাত্ত্য সংগ্রহ করেছি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তা নিয়ে কিছু একটা করবার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরেই। নানা…

error: Content is protected !!