ঢাকাই সিনেমা

বিনোদন প্রিয় ঢাকাবাসীর নগর জীবনে একসময় সারাবছরই লেগে থাকত উৎসবের আমেজ। বিভিন্ন ধর্মালম্বীর ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন ঈদ, মহরম, জন্মাষ্টমী, ঝুলন যাত্রা, চরখ পূজা, হালখাতা প্রভৃতি ছাড়াও সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মিছিল, মেলা ও শোভাযাত্রায় অংশ নিত তারা। মাঝে মাঝে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতিতে আঘাত লাগলেও ঢাকার বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছিল সার্বজনীন। ঢাকার মেলাতে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, খেলনা, তৈজসপত্রের পাশাপাশি আয়োজন করা হত সার্কাস, চরক, যাত্রাপালা প্রভৃতি।

এছাড়াও উনিশ-বিশ শতকে ঢাকার বিনোদনে নতুন যুক্ত হয় থিয়েটার, সিনেমা, বায়োস্কোপ ইত্যাদি। ঢাকার বিনোদনের বেশিরভাগই ছিল ধনাঢ্য-প্রভাবশালী ও তাদের অনুগামীদের জন্য। নিম্নবিত্তের জন্য বিনোদন ছিল না বললেই চলে। শহরের নিম্নবিত্তরা সাধারণত অনুষ্ঠান-উৎসবগুলোতে দর্শকের ভূমিকাই পালন করত। তবে যাত্রা-সার্কস-থিয়েটারে ঢাকাবাসীর অংশগ্রহণ ছিল লক্ষ্যণীয়।

সার্কাস-যাত্রা-থিয়েটার দেখার জন্য শহরবাসীর মাঝে সারা পরে যেত। গ্রামাঞ্চলে সাধারণত জমির ফসল কৃষকের গোলায় উঠার পরে আয়োজিত হত মেলার। আর এই মেলাতে সার্কাস-যাত্রা ছিল কেন্দ্রীয় আকর্ষণ। এ সময়টাতে কৃষকের হাতে অর্থকড়ি থাকত ; সে টিকেট কেটে উপভোগ করতে পারত সার্কাস-যাত্রা।

ঢাকার বেশ কয়েকটি স্থানে প্রতি বছরই আসর বসত সার্কাস-যাত্রা। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার ভিড়ে সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত চলত সার্কাস-যাত্রা। সাধারণত প্রতিদিন সার্কাসের কয়েকটি শো হলেও এক রাতে একটিই শো হত যাত্রার। পরবর্তীতে যাত্রা-সার্কাসের পাশাপাশি জায়গা করে নেয় নতুন বিনোদন মাধ্যম থিয়েটার। ঢাকায় মঞ্চস্থ থিয়েটার কোন কোনটা কয়েক ঘণ্টাব্যাপী হলেও কোন কোনটা চলত রাতব্যাপী। জানা যায়, যাত্রা থেকে থিয়েটার বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল ঢাকাতে। তবে ঢাকায় সিনেমার আসার পরে থিয়েটারে ব্যাপক ভাটা পরে।

বাংলার ইতিহাসে নানা কারণে ঢাকা বারবারই হয়ে উঠেছিল গুরুত্বপূর্ণ শহর। মসলিনের বিকাশকালে ঢাকার অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল বেশ ভাল। বাংলায় ভ্রমণকারী বিভিন্ন পর্যটকের বর্ণনায় জানা যায়, ঢাকায় নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামও ছিল মানুষের হাতের নাগালে। তবে মসলিন শিল্পের বিলুপ্তি ঘটলে ঢাকার অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পরে। রাজধানীও সরিয়ে নেয়া হয় ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে। ঢাকা হয়ে উঠে অনেকটা পরিত্যাক্ত। কমতে থাকে ঢাকার জনসংখ্যা। উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকেই ঢাকা নিয়ন্ত্রিত হতে শুরু হয় ইংরেজ কর্তৃক নবাব উপাধি প্রাপ্ত নববাদের দ্বারা।

পূর্বের মোগল নবাবদের মতো তারাও বিলাশবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল। ইংরেজ শাসনামলের ঢাকার নবাবদের অন্যতম কাজ ছিল ইংরেজদের খুশি রাখা। তারা ইংরেজদের খুশি রাখার জন্য তারা নানা আয়োজন করত ঢাকায়। শহরে অনুষ্ঠিত পূর্বের অনুষ্ঠান ও উৎসবগুলোর পাশাপাশি তারা বেশ কয়েকটি নতুন অনুষ্ঠান যোগ করে ঢাকার নগর জীবনে।

ঢাকার শাসকরা অধিকাংশ সময়ই ব্যস্ত থাকত নিজেদের নিয়েই। তবে শহরের ধনাঢ্য জমিদারদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের ফলে মাঝে মাঝে নগর জীবনে আসত বৈচিত্র। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় শহরে সার্কাস, যাত্রা, থিয়েটারের মত বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হত। সার্কাস পার্টিগুলো ঢাকার বাইরে থেকে আনা হলেও থিয়েটারের দলগুলো অধিকাংশই গড়ে উঠেছিল ঢাকাতে। তবে কলকাতা থেকে বিখ্যাত সব দল তাদের নাটক মঞ্চস্থ করতে ঢাকায় আসত। পেশাদারী নাট্যগোষ্ঠীর পাশাপাশি ঢাকাতে বেশ কয়েকটি সখের নাট্যদলও গড়ে উঠেছিল।

আবার অনেকে ব্যক্তিগত অর্থায়নেও নাট্যদল গড়ে তুলেছিল। ঢাকার নাট্য ইতিহাসে পূর্ববঙ্গ নাট্যসমাজ, ক্রাউন থিয়েটার, ডায়মণ্ড থিয়েটার, ইস্ট বেঙ্গল থিয়েটারের নাম উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীতে ঢাকায় সিনেমা থিয়েটারের জায়গা করে নেয়। ঢাকার সিনেমার কথা বলতে গেলে কয়েকটি সিনেমা হলের নাম এসে যায়। এগুলোর মধ্যে ছিল- লায়ন সিনেমা, পিকচার হাউজ, মুকুল হল প্রভৃতি। এ হলগুলো একসময় বাংলা-হিন্দি ছবির পাশাপাশি বিখ্যাত সব ইংরেজি ছবি দেখান হত।

যাত্রা-থিয়েটার-সিনেমার সঙ্গে যুক্ত বেশকিছু পেশাজীবী শ্রেণী গড়ে ওঠেছিল ঢাকা শহরে। এদের অন্যতম ছিল অভিনয় শিল্পী, বাদ্যযন্ত্রী, মেকআপ ম্যান, স্টেজ নির্মাতা, পোষাক নির্মাতা, টিকেট চেকার, আলোকসজ্জা কর্মীসহ আরো অনেকে। তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ভাঙাগড়া এখনো প্রায় অজানা তবে অনেকের স্মৃতিচারণে কিছু কিছু তথ্য পাওয়া যায়।

মূর্শেদূল মেরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

5 + three =

এই শহর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে তথ্য-উপাত্ত্য সংগ্রহ করেছি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তা নিয়ে কিছু একটা করবার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরেই। নানা…

error: Content is protected !!