ঢাকার শাসনপ্রক্রিয়া

ঢাকার শাসনপ্রক্রিয়ার পালে সবসময়ই লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। রাজনীতির নানা পট পরিবর্তনে শাসনপ্রক্রিয়াতে এসেছে নতুন নতুন সমীকরণ। কেন্দ্রীয় শাসকবর্গের ইচ্ছানুযায়ী ঢাকার শাসনব্যবস্থায় এসেছে বারবার এসেছে নানা পরিবর্তন। তবে এই শাসনপ্রকৃয়ায় কোন কোন ব্যবস্থা সময়ের প্রয়োজনে হলেও বেশিরভাগ ব্যবস্থাই ছিল চাপিয়ে দেয়া।

১৬০৮/১৬১০ সালের দিকে ঢাকা সুবা বাংলার রাজধানী হবার পর থেকে এখানে প্রাদেশিক প্রধান অর্থাৎ সুবেদার কর্তৃক পরিচালিত হতে শুরু করে। রাজধানী হওয়ার পূর্বেও ঢাকা কোন বিরাণভূমি ছিল না। তবে প্রসিদ্ধ কোন জনপদ ছিল বলেও জানা যায় না। তৎকালীন ঢাকার কোনো শিল্প-সাহিত্য-ইতিহাস এখনো সেভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে প্রাক-সুবেবাংলার ঢাকার প্রশাসনিক পরিচালনা সম্পর্কেও বিশেষ কিছুই জানা যায় না।

যতদূর জানা যায়, সুলতানী শাসনামলে ঢাকার পার্শ্ববর্তী সোনারগাঁ ছিল অত্র অঞ্চলের রাজধানী। মোগল সুবেদার ইসলাম খান ঢাকাকে বাংলার রাজধানী ঘোষণার পর থেকে এ শহরের গুরুত্ব বাড়তে শুরু করে।

তবে এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে রাজধানী হবার সবরকম সম্ভবনা ছিল বলেই ঢাকাকে মোগল বাংলার রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। রাজধানী হওয়ার মেতো সুযোগ সুবিধা এই জনপদে না থাকলে মোগল বাংলার রাজধানীর জন্য এ শহরকে নির্বাচন নিশ্চয়ই করা হতো না এটুকু বলা যায়।

ঢাকার রাস্তাঘাট-নৌপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, খাদ্য ও রসদ যোগাতে সুবিধাসম্পন্ন স্থান ছিল বলেই ঢাকাকে রাজধানী করা হয়েছিল। রাজধানী হবার পর থেকেই ঢাকার প্রশাসনিক ব্যবস্থা সুসংহত হতে শুরু করে।

মোগল শাসনামলে ঢাকার শাসনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে ড. আবদুল করিম তার মোগল রাজধানী ঢাকা গ্রন্থে লিখেছেন- “…কোতোয়াল শহরের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করতেন এবং মুহতাসিব শহরের জনগণের নৈতিক বিষয়াদি দেখাশুনা করতেন। তাঁরা উভয়ে নিজস্ব সংস্থা রক্ষণাবেক্ষণ করতেন।”

মোগল শাসনামলে সম্রাট কর্তৃক নিযুক্ত সুবেদার সম্রাটের প্রতিনিধি রূপে প্রদেশের নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে প্রদেশ পরিচালনা করত। প্রথমদিকে সুবেদার একাধারে ফৌজদারি বিচারকার্য ও প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করত। প্রদেশের রাজস্ব ও দেউয়ানী বিচারকার্য্যরে দায়িত্ব পালন করত দেউয়ান। মোগল শাসনের প্রথমদিকে প্রদেশের দেউয়ান ছিল সুবেদারের অধীনে। পরবর্তী সময়ে অবশ্য দেউয়ানকে সুবেদারের অধীন থেকে পৃথক করা হয়।

সম্রাট কর্তৃক নিযুক্ত এই দুই মোগল কর্মকর্তা তাদের অধীনে কিছুসংখ্যাক সহকারী নিয়োগের ক্ষমতা রাখত। তাদের অধীনে নিযুক্ত কয়েকজন সহকারীর পদবী পাওয়া যায় ড. আবদুল করিমের ঢাকা দি মোগল ক্যাপিটাল গ্রন্থে- “বখ্শি (সৈন্যবিভাগের কর্তা), সদর (দান, অনুদান ও ধর্মীয় বিভাগের প্রধান), কাজী (বিচারক), কোতোয়াল (শহরপুলিশের সুপারিয়েন্টেন্ডেন্ট), মীর-ই-বহর (এডমিরাল বা নৌ-সেনাধ্যক্ষ), আমীল বা আমলগুজার (রাজস্ব সংগ্রহকারী) ও কানুনগো (শাব্দিক অর্থ হল আইন ব্যাখ্যাকারী, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ছিলেন ভূমি রাজস্ব রেজিস্টাররক্ষক)।”

বাংলার মোগল সুবেদাররা অধিকাংশ সময় ব্যয় করত সাম্রাজ্য বিস্তার ও শত্রুর মোকাবেলায়। যুদ্ধ বিগ্রহেই তাদের সুবেদারীকালীন বেশিরভাগ সময় অতিবাহিত হত। রাজধানী হওয়ার কারণে বাংলার সুবেদারেরা ঢাকার আভ্যন্তরীণ উন্নয়নের চেয়ে বর্হিশত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ ও শত্রুকে হামলা করার কাজেই বেশি গুরুত্ব দিত।

ঢাকার শাসনকার্য পরিচালনার জন্যে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বাহিনীর প্রয়োজন হয়েছে। এরই কারণে কখনো ঢাকায় গঠন করা হয়েছে পুলিশবাহিনী, কখনো সেনাবাহিনী, কখনো নৌবাহিনী আবার কখনো বা চৌকিদার। ইংরেজ শাসনামলে সৃষ্টি করা হয়েছে কালেক্টর, ম্যাজিস্ট্রেট, অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট, জজ, জেলা জজ ইত্যাদি পদ।

ইংরেজ শাসনামলের শুরুর দিকে ঢাকার নবাব পরিবারকে দিয়ে পূর্বেকার ঢাকায় প্রচলিত ইসলামী পঞ্চায়েত ব্যবস্থা পুনরায় জাগরণ করা হয়। সে সময় ঢাকায় এ বিচারিক ব্যবস্থা বেশ জনপ্রিয়তা পায়। ঢাকাবাসী আদালতের কাঠগড়ার যাওয়ার চেয়ে ঢাকার নবাববাড়ি আহসান মঞ্জিলের দরবারে যেতেই বেশি পছন্দ করত।

১৮২৪ সালের দিকে মুন্সেফ ও সদর আমিন পদ দুটি সৃষ্টি করা হয় ; এ পদগুলোতে সাধারণত দেশীয়দেরই নিযুক্ত করা হত। পরবর্তী ১৮৩১ সালে প্রধান সদর আমিনের পদটি সৃষ্টি করা হয়। ১৮৩৩ সালে বাংলার প্রত্যেক জেলায় ২ জন সিনিয়র অফিসার ও ১ জন কালেক্টর নিযুক্ত ছিলেন। সে সময় পুলিশ বিভাগ ছিল কালেক্টরের অধীনে।

একই সময়ে জেলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ ছিল জেলা জজ। ১৮৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা সেক্রেটারিয়েট ; সে সময় এ প্রতিষ্ঠানটি ছিল ক্ষুদ্র, মাত্র ১ জন সেক্রেটারি ও ২ জন আন্ডার সেক্রেটারি দ্বারা পরিচালিত হত। একই বছর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদটি সৃষ্টি করা হয়। এভাবে যখন প্রয়োজন হয়েছে তখনই সৃষ্টি করা হয়েছে নতুন পদ বা পদবী।

এতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে ঢাকাকে নিয়ে শাসকবর্গের সুদূরপ্রসারি কোন চিন্তাভাবনা বা পরিকল্পনা ছিল না।

১৮৪০ সালে ঢাকার সিভিল সার্জন জেমস টেলরের প্রকাশিত গ্রন্থে বাংলার সরকারি বেশ কিছু বিভাগের নাম পাওয়া যায়। তার গ্রন্থে উল্লেখিত সরকারি বিভাগগুলোর মধ্যে ছিল- নওয়ারাহ বা নৌবহর, তোপখানা বা গোলন্দাজবাহিনী ও টাকশাল। নওয়ারাহ বিভাগে ৭০০-এর ঊর্ধ্বে রণতরী এবং শাসনকর্তাদের ব্যবহারের জন্য বেশ কিছুসংখ্যক বিরাট প্রমোদতরীও ছিল। দুটি জাহাজ জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে সাজিয়ে প্রতিবছর আগ্রায় সম্রাটের কাছে প্রেরণ করা হত।

১৮৪৫ সালে ইংরেজ ব্যবস্থাপনায় জেলার প্রশাসন তিনজন সিনিয়র অফিসারের মাধ্যমে পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়- ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট, ডিস্ট্রিক্ট জজ, কালেক্টার। অবশ্য ১৮৫৯ সালের জেলার এই গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর পুনবিন্যাশ করে একটি কমিয়ে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট এ্যান্ড কালেক্টার ও ডিস্ট্রিক্ট জজ পদ দুটি রাখা হয়।

১৮৪৮ সালের আইনি পরিবর্তনের ফলে ভারতের গভর্নর জেনারেল ও বাংলার গভর্নর জেনারেলের দায়িত্ব না থাকায় রানী ভিক্টোরিয়া বাংলার জন্য একজন লেফটেন্যান্ট গভর্নর নিয়োগ দেন। ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ও আসাম অর্থাৎ বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি ভারতের গভর্নর জেনারেল তথা বাংলার গভর্নর দ্বারাই শাসিত হত।

অবশ্য ১৮৫৩ সালেই রানী ভিক্টোরিয়া বাংলা প্রদেশের জন্য স্বতন্ত্র গভর্নর নিয়োগ দেয়া হয়। ৫ নভেম্বর ১৮৫৮ সালে রানী ভিক্টোরিয়ার ঘোষণানুযায়ী ভারতবর্ষের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসিত অঞ্চলগুলো সরাসরি ইংল্যাণ্ডের রাণী ও ব্রিটিশ পার্লামেন্টের শাসনে চলে যায়। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ পূর্ব পর্যন্ত তা বলবদ থাকে।

ইংরেজ শাসনামলে জেলা প্রশাসকের পদটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শাসন, রাজস্ব আদায় ও শাস্তিদান উভয় প্রক্রিয়া কার্যকর করার ক্ষমতাসম্পন্ন ছিলেন।

১৮৬১ সালে ইংরেজ পার্লামেন্টে আরেকটি আইন পাসের মাধ্যমে ভারতের সমস্ত ঊর্ধ্বতন সরকারি পদ ও পুলিশ প্রধানের পদটি বিশিষ্ট ইউরোপীয়ানদের আর বাদবাকি সরকারি পদগুলো দেশীয়দের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়।

রফিকুল ইসলামের ঢাকার কথা গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে- “…স্থানীয় প্রশাসনব্যবস্থা অবশ্য ১৮৫৬ সালের দিকে স্বল্প পরিসরে চালু হয় ; ঐ বছরই চৌকিদারি আইন পাস ও জেলা ম্যাজিস্ট্রে কর্তৃক পঞ্চায়েত মনোনয়নের ব্যবস্থা করা হয়। স্থানীয় রাস্তাঘাট নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৮৭১ সালে বঙ্গীয় লেজিসলেটিভ কাউন্সিলে ‘ডিস্টিক্ট রোড সেস বিল’ পেশ ও ঐ বছরই আইনটি চালু করা হয়। ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল লোকাল সেলফ গভর্নমেন্ট এ্যাক্ট বা স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন আইন পাস হয়।

বেঙ্গল মিউনিসিপ্যাল বিল পাস হয় ১৮৮৪ সালে এখাবে ধীরে ধীরে ঢাকাতে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহ গড়ে উঠতে থাকে।”

মূর্শেদূল মেরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

17 − one =

এই শহর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে তথ্য-উপাত্ত্য সংগ্রহ করেছি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তা নিয়ে কিছু একটা করবার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরেই। নানা…

error: Content is protected !!