মরণ চাঁদ

ঢাকাবাসী চিরকালেই উৎসব প্রিয়। কিংবদন্তি অনুযায়ী, ১৬০৮ বা ১৬১০ সালে ইসলাম খানের নৌকা যখন বুড়িগঙ্গা নদী তীরে ভিড়ে; সে সময় তিনি বেশ কিছু ঢাকীকে নদী তীরে ঢাক বাজাতে দেখতে পান। এ থেকেও মোটামুটি ধারণা পাওয়া যায় যে বহু পূর্ব থেকেই এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ছিল পূঁজা-পার্বন-উৎসব পালনের প্রবণতা। আর ঢাকার উৎসব বা অনুষ্ঠানের খাবারের তালিকার দিকে তাকালে মিষ্টির উপস্থিতিটা বরাবরই চোখে পড়ে।

একসময় ঢাকার মিষ্টি প্রস্তুতকারী অধিকাংশই ছিল সনাতন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকরা। হিন্দু ধর্মাবলম্বী মিষ্টি প্রস্তুতকারীরা পূর্ব থেকেই এই শহরের মিষ্টির যোগান দিয়ে থাকলেও তাদের সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানা যায় না। হিন্দুদের মাঝে ঘোষ পদবীধারীরাই সাধারণত মিষ্টি ও মিষ্টিজাত খাবার প্রস্তুত করে থাকে।

অন্যদিকে শহরের মুসলমানরা এই পেশায় জড়িত থাকলেও তারা সংখ্যায় ছিল কম। তাদেরকে মিষ্টি প্রস্তুতকারীর বদলে বলা হতো মোরব্বাওলা। সে সময় ঢাকায় সাধারণত চানা থেকে মিষ্টি প্রস্তুত করা হতো। ঢাকার হিন্দু মিষ্টি প্রস্তুকারীরা অনেক রকমের মিষ্টি প্রস্তুত করলেও মুসলমানরা মাত্র কয়েক ধরনের মিষ্টি প্রস্তুত করত।

ঢাকার মুসলমানদের প্রস্তুতকৃত মিষ্টির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- লাড্ডু, বাদামের বিভিন্ন প্রকারের মিষ্টি, মোরব্বা, নকুল, মুরাগী, শকর পারা, জিলাবী/জিলাপী, বালুশাহী, খাজা, পেড়া, বুনদিয়া, আমৃতি ইত্যাদি।

ঢাকাবাসীর কাছে মিষ্টি ছিল অন্যতম পছন্দের খাবার। ঢাকার ঘরে ঘরেও প্রস্তুত করা হতো বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি। ঢাকার গৃহস্থলী নারীরা ঘরেই প্রস্তুত করত নারিকেলের বরফি, ডিমের হালুয়া প্রভৃতি। কিরণশঙ্কর সেনগুপ্তের চল্লিশের দশকে ঢাকা গ্রন্থ থেকে জানা যায়- “ঢাকার মিষ্টি কারিগরদের মোতিচুরের লাড্ডু ছিল বিশেষ অবদান”।

মুসলমান মিষ্টি প্রস্তুতকারীদের মধ্যে প্রথমে লাক্ষ্মৌ থেকে মাদার বখশ্ হালুয়ায়ী (মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারী) ও আলাউদ্দিন হালুয়ায়ী ঢাকার চকবাজারে মিষ্টির দোকান খুলেন। জানা যায়, মাদার বখশ্ ও আলাউদ্দিন হালুয়ায়ী ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহর আমন্ত্রণে ঢাকায় আসেন।

ব্যবসায়ীক সাফল্যের কারণে তারা ঢাকাতেই স্থায়ী বসবাস শুরু করেন। ক্রমেই তারা ঢাকাবাসীর কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের হাত ধরেই এ শহরে হিন্দুস্তানী মিষ্টির প্রসার ঘটে বলে অনেকে উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে সোহন হালুয়া অর্থাৎ পেস্তা-বাদাম কিসমিস সহযোগে প্রস্তুত করা পাপড়ি। এরপূর্বে ঢাকা শহরে পাপড়ির প্রচলিত থাকলেও মূলত এই সময়ই তার প্রকৃত বিকাশ লাভের জনশ্রুতি পাওয়া যায়।

একসময় শহর ঢাকায় প্রচুর মিষ্টি ফেরিওয়ালা ছিল। তারা ঢাকাবাসীর কাছে ছিল বেশ জনপ্রিয় ও পরিচিত। বোরকা পরিহিত মহিলারাও বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে মিষ্টি বিক্রি করত। মহিলা ফেরিওয়ালাদের বিক্রিত মিষ্টির মধ্যে ছিল ঘরোয়া মিষ্টি, মাস্কট হালুয়া, চালকুমড়ার মোরব্বা, বরফি, পোস্তার বরফি, নিশাসতার টিকিয়া, নারিকেল/গাজরের হালুয়া, লাড্ডু ইত্যাদি। এছাড়া ঢাকার রাস্তায় ফেরি করে বা গলির মোড়ে প্রত্যেক দিন বসত মাখন, মাঠা বা ঘোল, দই ইত্যাদি।

পূজা-পার্বনের পাশাপাশি সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতেও খাবারের তালিকায় দেখা যায় মিষ্টির নাম। এছাড়া ঢাকার মেলাগুলোতে বসত মিষ্টির দোকান। শহরের মুসলমানরা ঈদের দিন মিষ্টি জাতীয় খাবার বানাত। শব-ই-বরাতের রাতে মিষ্টি জাতীয় হালুয়া বানিয়ে একে অন্যের বাড়িতে বিতরণ করত। এক সময় ঢাকার রেওয়াজ ছিল বিয়ে বাড়িতে রঙিন নকশা করা মাটির হাড়িতে করে চন্দ্রপুলী ও বাদামের মিষ্টি নিয়ে যাওয়ার।

ঢাকার কিছু কিছু এলাকা ঢাকাবাসীর কাছে বিশেষ বিশেষ মিষ্টির জন্য ছিল আলাদাভাবে পরিচিত। এর মধ্যে ছিল- উর্দু বাজারের চৌরাস্তা প্যাড়া মিষ্টির জন্য। সম্ভবত লালবাগ ও চক ছিল মিঠাইওয়ালা খাজার জন্য এবং বাংলাবাজার ও ফরাশগঞ্জ ছিল বিয়ে-শাদীর মিষ্টি প্রস্তুতের জন্য প্রসিদ্ধ।

…………………………………………….
স্থিরচিত্র:
Maran Chand Ghosh & Sons
at Nawabpur Road in 1967
– Photo Roger Gwynn

মূর্শেদূল মেরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

seventeen + nine =

এই শহর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে তথ্য-উপাত্ত্য সংগ্রহ করেছি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তা নিয়ে কিছু একটা করবার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরেই। নানা…

error: Content is protected !!