ঢাকার অধিবাসী

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখায় যায় শাসকবর্গের পালাবদলের সাথে সাথে ঢাকায় এসেছে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষজন। নাগরিক সুবিধা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের জন্য বিভিন্ন সময় ঢাকা শহরে ভিন্ন ভিন্ন অধিবাসীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও তুলনামূলকভাবে সনাতন হিন্দু ধর্মালম্বী এবং মুসলমান ধর্মালম্ববীদের বসতিই অধিক লক্ষ্য করা যায়।

তাদের অনেকের আদিভূমি এই অঞ্চল হলেও আবার অনেকেই ভারতবর্ষ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থেকে এসে এ শহরে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছেন। প্রকৃতপক্ষে শাসকদের আগত দেশ ও ধর্মবিশ্বাসের সাথে সঙ্গতি রেখে বিশেষ সুবিধা লাভের আসায় বিভিন্ন সময় ঢাকায় দলে বলে এসে বসতি গড়েছে বিভিন্ন জাতি-বর্ণ-গোত্রের মানুষজন।

ঢাকায় আগত বহু দেশ ও সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে এসে ঢাকাকে ভালবেসে বা জীবিকার উদ্দেশ্যে অথবা একান্ত বাধ্য হয়ে থেকে যান এই শহরে। ঢাকায় আগত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেকে আসেছিলেন ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে আবার কেউ এসেছিলেন ভাগ্য বদলের উদ্দেশ্যে। আজকে ভাবতে হয়ত অবাক লাগবে একসময় ঢাকায় বর্হিবিশ্বের বহুমানুষ আসত ভাগ্যবদলের উদ্দেশ্যে।

এ শহর ছিল ভাগ্যবদলের অন্যতম স্থান। তবে এই শহরের আদিবাসীদের কথা তেমন জানাই যায় না। যাদের বিচরণের স্থানে গড়ে উঠেছে এই শহর তারাই থেকে গেছে ইতিহাসে আড়ালে। পরবর্তিতে যারা এসেছে তারাই কালের স্রোতে হয়ে উঠেছে এই শহরে অধিবাসী।

শুধু বর্হিবিশ্বই নয় ঢাকাকে ঘিরে থাকা বাংলা অঞ্চলের বিভিন্ন জমিদাররাও নিজেদের লোকোবল নিয়ে এ শহরে এসেছে বাণিজ্য ও বিনোদনের আশায়। তারাও অনেকে এই শহরে স্থায়ী হয়েছেন। আবার নাগরিক সুবিধার কথা চিন্তা করে অনেকে এই শহরে গড়ে তুলেছিলেন দ্বিতীয় আবাস।

মোটকথা নানা অঞ্চলের মানুষ এই শহরে এসে একটা মিশ্র জনগোষ্ঠী তৈরি করেছে। এতো সব মানুষের আড়ালে এই শহরের এই জনপদের আদিবাসীরা সকলের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে নাকি তারা এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল তা বলা কঠিন।

তবে শহরের আদি বসতি ও পাড়া-মহল্লার নাম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় শহরের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন পেশাজীবীদের বসতি ছিল। সেসময় নিজ নিজ সম্প্রদায় বা পেশাজীবীরা থাকতো শহরের আলাদা আলাদা মহল্লায়।

তাদের বেশিভাগই বাইরে থেকে আগত। মূলত শাসকবর্গের ইচ্ছা বা চাহিদা অনুযায়ী নতুন নতুন কর্ম যখন এই শহরের সুচিতে যোগ হয়েছে তখন সেই পেশায় দক্ষ শ্রমিকদের দলেবলে নিয়ে আসা হয়েছে এই শহরে। এবং তাদের থাকবার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে নির্দিষ্ট স্থান।

শ্রী শিশিরকুমার বসাক তার ঢাকা নগরীর ইতিবৃত্ত প্রবন্ধে উল্লেখ করেন- “ঢাকা বহুকাল পর্য্যন্ত মুসলমানদের রাজধানী থাকায় অন্যান্য স্থানাপেক্ষা এখানে মুসলমান অধিবাসীর সংখ্যা অত্যন্ত অধিক। …মুসলমানগণ অপেক্ষাকৃত শেখ সম্প্রদায়ভুক্ত ; সৈয়দ , মোগল ও পাঠানদিগের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত অনেক অল্প।

হিন্দুদিগের মধ্যে ব্রাহ্মণ, কায়েস্থ, বৈদ্য, তন্তুরায়, বাড়–ই, অর্থাৎ সূত্রধর, বারুই, বেণিয়া, গোয়ালা, ধোপা, নাপিত, কুম্ভকার, জেলে, কৈবর্ত, যুগী, চাষা, শুঁড়ী ইত্যাদি প্রধান। চণ্ডাল ও কোচ জাতিও হিন্দুধর্ম্ম স্বীকার করে ; ইহাদের সংখ্যাও অল্প নহে। জাতিভ্রষ্ট অনেক হিন্দু বৈষ্ণবসম্প্রদায়ভুক্ত।”

অধ্যাপক রংগলাল সেন তার ঢাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন- “১৬০৪ সালে বারভূঁইয়ার অন্যতম কেদার রায় ও তাঁর রাজধানী শ্রীপুরের পতন ঘটলে অসংখ্য তাঁতী ও কারিগর শ্রেণীর লোকজন ঢাকায় আসতে বাধ্য হয়।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, ইসলাম খান যখন ঢাকা আসেন তখন এক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অমুসলিম জনগোষ্ঠী সেখানে অবস্থান করছিল। তিনি প্রায় এক লাখ লোক নিয়ে ঢাকা আসেন, যারা সেখানে বসতি স্থাপন করে। এভাবে ঢাকা শহরে সামাজিক কাঠামোর শুরুতেই একটি মিশ্র জনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ঠ্য নিয়ে গড়ে উঠে। পুরনো ঢাকা শহরের পূর্বদিক হিন্দু অধ্যুষিত, যা আজও উল্লেখযোগ্য হিন্দুদের আবাসস্থল, আর পশ্চিম দিক মুসলিম প্রধান, যেখানে ইসলাম খানের সাথে আগত লোকজন বসতি স্থাপন করেন।

…কুট্টি ছাড়া ঢাকার অপর মুসলিম সনাতন সামাজিক গোষ্ঠী খোশবাসী নিজেদের শহরের আদি বাসিন্দা বলে মনে করে। এরা জৌপুরের মৌলানা কেরামত আলীর অনুসারী। ধনী ব্যবসায়ী। ঢাকা শহরের দুটি প্রাচীন মুসলিম সামাজিক গোষ্ঠীর মতো হিন্দুদেরও দুটি সনাতন সামাজিক গোষ্ঠী রয়েছে। এরা হচ্ছে বসাক ও শাঁখারী।”

ঢাকায় আগত বিভিন্ন অধিবাসীদের মধ্যে বিভিন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত সনাতন হিন্দু, মুসলমান, খ্রীস্টান সম্প্রদায় উল্লেখযোগ্য হলেও ছিল নানা দেশের অধিবাসী। আর এসব অধিবাসীদের মধ্যে- ব্রিটিশ, ফরাসী, ওলন্দাজ, আরমানিয়, আলবেনিয়, পর্তুগিজ, তুর্কি, ইরানী উল্লেখযোগ্য।

ঢাকায় আগত বিদেশীদের মধ্যে আরমানিয়রা অল্পদিনের মধ্যেই প্রভাবশালী জমিদারে পরিণত হন। ধনাঢ্য আরমানিয়রা ঢাকায় বসবাসের জন্য নির্মাণ করেন প্রাসাদময় অট্টালিকা ও বাগানবাড়ি। শহরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা বা পৃষ্ঠপোষতায়ও তারা বিশেষ ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে ইংরেজরা এ শহরে স্থায়ীভাবে বসবাসের কথা চিন্তা করেনি। চাকরিগত বা ব্যক্তিগত যে কোন কারণেই তারা ঢাকায় আসুক না কেন ; তাদের প্রধান চিন্তা-চেতনা ছিল শাসন ও অর্থ উপার্জন। 

আরমানিয়রা যেমন এই শহরে প্রভাব প্রতিপত্তি নিয়ে চলাচল করতো তেমনি বিভ্ন্নি অঞ্চল থেকে আসা বিভিন্ন শ্রমজীবী মানুষ ঘুপচি ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করত। এই শহরে আগত বিচিত্র সব অধিবাসী কি করে এই শহরেই স্থায়ী হয়ে গেল আবার যারা কয়েক প্রজন্ম থেকেও এ শহরের হতে না পেরে ফিরে গেল তাদের বিষয়ে পালাক্রমে লিপিবদ্ধ হবে ঢাকার ইতিহাসের এই ঢাকার  অধিবাসী অংশে। সে পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকুন।

মূর্শেদূল মেরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

9 − 5 =

এই শহর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে তথ্য-উপাত্ত্য সংগ্রহ করেছি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তা নিয়ে কিছু একটা করবার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরেই। নানা…

error: Content is protected !!