মিটফোর্ড হাসপাতাল

ইতিহাসের পাতায় দেখা যায় একসময় ঢাকাবাসীকে নিয়মিত ভুগতে হত ম্যালেরিয়া, কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েড, গুটি বসন্তের মত সব মারাত্মক অসুখ-বিসুখে। এ সকল ব্যাধি মাঝেমাঝেই আকার নিত মহামারিতে। একসময় এ শহরে মহামারী, দুর্ভিক্ষা, বন্যা ছিল অতি সাধারণ ব্যাপার।

দূষিত খাবার জল, যত্রতত্র মল-মূত্র ত্যাগ, নিয়ম না মেনে মৃতদেহ সৎকার এবং আবর্জনার অব্যবস্থাপনাসহ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে এ শহরে রোগজীবানু ছড়িয়ে বিভিন্ন সময়ই সংক্রামকবাহী রোগ মহামারীতে রূপ নিতে দেখা যায় ইতিহাসের পাতায়।

নথিপত্রে দেখা যায়, ১৮১৭ সালে ঢাকা শহরে কলেরা মহামারীর আকার ধারণ করে ; যা নিয়মিত চলতে থাকে। এতে শহরের বহু লোক মারা যায়। এক হিসাবে পাওয়া যায়, ১৮২৫ সালে কলেরায় ঢাকায় মৃতের সংখ্যা ছিল ৪২৭ জন।

১৮৫০ সালে জ্বর ও বসন্ত এবং ১৮৫১, ১৮৫৩, ১৮৫৫-১৮৫৭ সালে কলেরা মারাত্মক আকার ধারণ করে। ইংরেজ শাসনামলে এই মহামারির প্রকোপে সেনাবাহিনী আক্রান্ত হলে ঢাকার চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নয়নের কথা প্রথম ইংরেজ সরকারের কর্ণগোচর হয়।

এর ফলে, ১৮৫৯ সালে একটি রাজকীয় কমিশন গঠন করা হয়। ১৮৬৩ সালে এই কমিটি এক রিপোর্ট পেশ করে। এ রিপোর্টের কার্যকারিতা সম্পর্কে জানা যায় না।

পরবর্তী ৬ এপ্রিল ১৮৬৮ সালে ঢাকা জেলার সিভিল সার্জন কর্তৃক বাংলার সেনিটারি কমিশনারকে জেলার জনস্বাস্থ্যের উপর রিপোর্ট প্রদান করা হয়। সম্ভবত এর প্রেক্ষিতে ১৮৬৯ সালে জনস্বাস্থ্য কমিশন বাতিল করে মেডিকেল অফিসারের নাম পরিবর্তন করে সেনিটারি কমিশনার রাখা হয়।

সে সময় তাদের দায়িত্ব ছিল সরকারকে জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে উপদেশ দেয়া। ১৮৬৪ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি। তারা নগরে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় ছিল অপ্রতুল।

১৮৭০ সালের দিকে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি নগর পুলিশকে দিয়ে জন্ম-মৃত্যু রেজিস্ট্রেশন ও সিভিল সার্জনদের দিয়ে টিকা দান কার্যক্রমের জন্য নির্দিষ্ট তহবিল প্রদান করে। পরবর্তী ১৮৮৬ সালে প্লেগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা শহরের হাজার হাজার লোক মারা যায়।

দীনেশচন্দ্র সেন তার স্মৃতিচারণে বলেছেন- “১৮৮১ সালে ঢাকায় যেরূপ ওলাউঠার প্রকোপ হইয়াছিল, সেরূপ উৎকট অবস্থা বড় দেখা যায় না। প্রথমতঃ তাঁতীবাজারের পথে যাইতে ‘হরিবোল’ শব্দে বহু মৃতব্যক্তিকে লইয়া যাইতে দেখিতাম, তখন মড়াটা ডানদিকে কি বামদিকে দেখিলাম, তাহাই লইয়া মনে বিতর্ক করিয়া যাত্রার শুভাশুভ নির্ণয় করিতাম।

…কলেরা তাঁতীবাজার হইতে শুরু করিয়া ধীরে ধীরে বাবুবাজার মুখে রওনা হইল। স্কুলে যাইয়া দেখিতাম ক্রমশঃ ছেলে কমিয়া যাইতেছে, তাহারা ভয়ে ঢাকা ছাড়িয়া যাইতেছে।

…ঢাকার মতো ক্ষুদ্র শহরে সে যে কি ভয়-তাহাও কলেরা আবার সংক্রামত! সমস্ত শহরটির উপর একটা মৃত্যুর ছায়া পড়িয়াছিল-সকলের মুখে কালি মা।

…কলেরায় মরিয়া যাইব এই ভয়ে দিনরাত ঔষধ খাইতাম। সালফিউরিক এসিড ডিল্. পকেটেই থাকিত, শিশির ছিপি খুলিয়া ঔষধ পড়িয়া আমার অনেক আলপাকা ও গরদের জামা জ্বলিয়া গিয়াছে।

শুধু সালফিউরিক এসিড নয়, পিপারমেন্ট, বিসমাথ, ভুবনেশ্বর, ক্লোরোডাইন, স্পিরিট ক্যাস্ফার প্রভৃতি খাইয়া এমনই পেটের অবস্থা দাঁড়াইয়াছিল যে প্রায়ই আমার কোষ্ঠাবদ্ধ হইয়া থাকিত।”

১৮৯৭ সালে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আবারো প্লেগ মহামারির আকার ধারণ করে। ১৯১০ সালে শহরে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে ১৪১ জনের মৃত্যু ঘটে। ১৯১৯ সালে বসন্তর মাহামারিতে ৪৬৬ জন মারা যায়।

১৯২৫-২৬ সালে ডায়রিয়া ও আমাশয়ের মত রোগে আক্রান্ত হয়ে শহরে ৩৪৯জন লোকের মৃত্যুর সংবাদ জানা যায়। ১৯২৯ সালে ঢাকায় ম্যালেরিয়া/কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে ১৪৪ জন মারা যায়। শুধু মহামারী নয় শহরে ছোট-খাট রোগেও মৃতের সংখ্যা নেহাৎ কম ছিল না।

আদিতে এ শহরে রোগ প্রতিরোধে ঢাকাবাসীর ভরসা ছিল তুক-তাক-তাবিজ-কবজ ও কবিরাজি চিকিৎসায়। মোগল ও ইংরেজ শাসনামলে ঢাকার বেশ কয়েকজন প্রসিদ্ধ কবিরাজের নাম পাওয়া যায়। পাওয়া যায় একজন পর্তুগিজ শল্য চিকিৎসকের নামও।

তবে ইংরেজ শাসনামলে ঢাকায় আসতে শুরু করে সিভিল সার্জনদের আগমন ঘটতে থাকে। পরবর্তী সময় ঢাকায় হাসপাতাল স্থাপিত হলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় লাগে আধুনিক বিজ্ঞানের ছোঁয়া।

তারও পরে ঢাকায় মেডিকেল স্কুল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয় আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ও দেশীয় চিকিৎসক শিক্ষার কার্যক্রম। অবশ্য ঢাকায় মেডিকেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায়ও দেখা দিয়েছিল নানা মতভেদ।

মূলত বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে ঢাকার গুরুত্ব মোগল ও ইংরেজ শাসকদের কাছে আকষর্ণীয় থাকলেও ঢাকাবাসীর রোগ-বালাই প্রতিকারে তাদেরকে কখনো বেশি উৎসাহী হতে দেখা যায় নি।

……………………………………
আলোকচিত্র: মিটফোর্ড হাসপাতাল

মূর্শেদূল মেরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

fifteen + 6 =

এই শহর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে তথ্য-উপাত্ত্য সংগ্রহ করেছি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তা নিয়ে কিছু একটা করবার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরেই। নানা…

error: Content is protected !!