ঢাকার দোকানপাট

সম্ভবত আদিতে ঢাকায় জিনিসপত্র বেচাকেনায় প্রচলিত ছিল বিনিময় প্রথা। সেসময় বেচাকেনার মূল কেন্দ্র ছিল হাট-বাজার বা মেলাতে। তবে উনিশ শতক থেকে শহরের বাজার ছাড়াও বিভিন্ন মহল্লায় স্থায়ী দোকান বসার কথা জানা যায়। 

১৮২৪ সালে বিশপ হেবার ঢাকার বাজারে ইউরোপীয় পণ্যের দোকান দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। এই দোকানের খরিদদার ছিল সম্ভবত ঢাকাস্থ বিদেশী বণিক, স্থানীয় জমিদার ও ঢানাধ্য শ্রেণী।

বিভিন্ন উৎস থেকে জানা যায়, ঢাকার অভিজাত পরিবারগুলো তাদের বসতবাড়ি ইউরোপীয় পণ্য দিয়ে সাজাতে বেশি পছন্দ করত। ঢাকার নবাব খাজা পরিবারের সদস্য ও ঢাকার অভিজাত, ধনাঢ্য পরিবারের সদস্যরা নিজেদের গৃহ ইউরোপীয় আসবাবপত্র দিয়ে সাজাতে বেশি আগ্রহই সম্ভবত ঢাকায় ইউরোপীয় পণ্যে দোকান গড়ে ওঠার কারণ।

বিশপ হেবারের বর্ণনায়- “এ সব বাজারে ছোট ছোট দোকান, যা আমি কখনই আশা করিনি, বিলেতি প্রসাধনী, লেখবার ডেস্ক, টেবিল, খাবার ছুরি, কাটা চামচ, নানাবর্ণের সুতির ছিট কাপড়, পিস্তল, পাখি শিকারের হালকা বন্দুক, কাঠ ইত্যাদির খোদাই কাজ ও এমনকি নানা ধরনের বিলেতি জিনিস বা তার অনুকরণে প্রস্তুত করা সামগ্রী দিয়ে ভর্তি।

এ থেকে বোঝা যায় যে স্থানীয় মধ্যবিত্ত এমনকি সাধারণ মানুষও কিভাবে বিলেতি জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উঠছে। ম্যাজিস্ট্রেট হেনরী ওয়াল্টারস ১৮৩০ সালে ঢাকার আদমশুমারিতে ১২৬টি মুসলমান বণিক পরিবার রয়েছে বলে উল্লেখ করেন এবং ১০৮০টি মুসলমান দোকানদার পরিবার ছিল বলেও জানান।”

ঢাকার দোকানপাট নিয়ে আলাদাভাবে বিশেষ কোন গবেষণা এ যাবৎ হয়নি। তাই এ সম্পর্কেও খুব বেশি জানা যায় না। নানা উৎস থেকে বিচ্ছিন্নভাবে প্রাপ্ত তথ্য থেকে ঢাকার দোকানপাট-কলাকারখানা সম্পর্কে কিছু কিছু তথ্য জানা যায়। অনেকের জীবনী গ্রন্থতেও পাওয়া যায় উনিশ শতকের ঢাকার দোকানপাটের টুকরো টুকরো কিছু খবর।

পরিতোষ সেনের জিন্দাবাহার গ্রন্থে ঢাকা শহরের কয়েকটি দোকানের বর্ণনা পাওয়া যায়- “নবাববাড়ির ফটকের একটু পরেই যাত্রা থিয়েটারের পোশাকের দোকান।

এ দোকানটিতে সোনারূপার জরির কাজ করা রাজা-নবাব-বাদশাহের জোব্বা, ঢাল-তলোয়ার, তীর-ধনুক, নানারকমের টুপি, পাগড়ি, মুকুট, চামর, নকল দাড়ি-গোঁফ, দেব-দেবীর পরচুলা, বাঘের চাল, ত্রিশূল, মেয়েদের নানারকম জামাকাপড়, পুলোমা, তড়কা, বকাসুরের মুখোশ প্রভৃতি।

এ দোকানটির পার্শ্বেই কালাচাঁদ সাহার বিখ্যাত মিঠাই-মণ্ডার দোকান। বাবুবাজারে সারি সারি মুসলমানি খাবারের দোকান। ঘি, গরম মসলা, পেঁয়াজ-রসুন এবং হিং-এর গন্ধে সন্ধেবেলার হাওয়াটা মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে।

বড় বড় লোহার পরাতে কালেজা-কা সালন, শামি আর শিক কাবাব, মাটন কাটলেট আর রোস্ট, পরোটা, রুমালী রোটি, ফুরকা, ভাত, জাফরানি রঙের চাপ ইত্যাদি।”

নাট্যকার সাঈদ আহমদের স্মৃতিচারণে ঢাকার দোকানপাট– “পাটুয়াটুলিতে দুটি গ্রামোফোন কম্পানি ছিল একটির নাম ‘এস ব্যানার্জী’ আর অপরটির নাম ছিল ‘রয় এ্যান্ড সন্স’। রাস্তার দু’পাশে মুখোমুখি অবস্থানে ছিল দোকান দুটি। মি এস ব্যানার্জি আর মি রয় এই দুই কর্ণধার নিজ নিজ দোকান দুটি চালাতেন।

এস ব্যানার্জি ছিলেন ফর্সা, মোটাসোটা ও ভারি শরীর। তার বিশাল গোঁফ ছিল আর সবসময় প্যান্টে বেল্ট বেঁধে শার্ট ইন করে পরতেন।

পক্ষান্তরে রয় ছিলেন হ্যাংলো-পাতলা, কালো আর সবসময় ঢেঁকুর তুলতেন। সে সময় পাটুয়াটুলি ছিল জাঁকজমকপূর্ণ মার্কেট প্লেস। ঘড়ি, জুয়েলারি আর কাপড়ের অসংখ্য দোকান। দামি ঘড়ি কিনতে হলে পাটুয়াটুলী যেতেই হবে। আরেকটি দ্রষ্টব্য দোকান ছিল পাটুয়াটুলীতে- স্ট্যাম্পের।

দোকানগুলোতে দেশ-বিদেশের কালেকশন দেখতাম। ঢাকায় দু’চারটা দোকান ছিল স্ট্যাম্পের, পাটুয়াটুলী আর নবাবপুরে।”

আজাহার হোসেন তার সেই সোনালী দিনগুলি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- “সেই সময় (১৯৩৫ সালের দিকে) ঢাকা শহরে দোকান পাট তেমন বেশী ছিলনা।

তবে অভিজাত দোকানের মধ্যে ছিল নবাব গেইটে হামিদের দোকান, বংশী বাজারে সংাভির দোকান, নবাবপুরে অমৃত লাল পালের দোকান, পাটুয়াটুলিতে যতীনের দোকান, পি কে বসাকদের আলোক সজ্জার দোকান, ইসলামপুরে নগরবাসী সুরের দোকান, ওয়াইজ ঘাটে ফেক্টো রেডিওর দোকান। প্রয়োজনীয় প্রায় সব জিনিষই ঐসব দোকনে পাওয়া যেত।

…সদর ঘাটে দেখা যেত নান জাতীয় ফল বিক্রেতা-ওয়ালাকে। বিক্রেতা বেশীর ভাগই মুসলমান ও ক্রেতা অধিকাংশ হিন্দু। বিক্রেতার গায়ে থাকত একটা ছেঁড়া গেঞ্জি ও পরণে লুঙ্গি আর ক্রেতার গায়ে থাকত ফিন ফিনে আদ্দির পাঞ্জাবী, পায়ে নিউকাট পেটেন্ট লেদার পামসু, হাতে ছড়ি।

…এ-ছাড়া রোজ ভোর বেলা মাঝ বয়সী মেয়েরা পিঠা বিক্রী করতে আসত। নানা রকমের পিঠা। তারা পিঠা, লারুয়া বিস্কুট নানখাতাই ও ডিমের তৈরী একটা জিনিষ বিক্রী করত যাকে “মোকরাম” বলা হোত। মোকরাম এত হাল্কা হোত যে ৭/৮ খেলেও মনেই হোতনা যে কিছু খেয়েছি। তবে বেশ মিষ্টি ও সুস্বাদু ছিল এই মোকরাম। …এক আনায় দুটি পাওয়া যেত।”

ভবতোষ দত্ত তার স্মৃতিচারণে বিশ শতকের সূচনালগ্নের ঢাকা ফেরিওয়ালা সম্পর্কে বলেছেন- “রাস্তা দিয়ে সকালে বিকেলে ডাক দিয়ে যায় ‘বাঘরখানি’-প্রকাণ্ড সাইজের স্বদেশী ক্রিমক্র্যাকার।

ধামাতে থাকে আরো নানা রকমের ‘হিন্দু’ বিস্কুট-যারা কোনোটার নাম ‘তক্তি’, কোনোটার ‘নারিকোলি’-আর যার কোনোটারই দাম এক পয়সার বেশি নয়।

বিকেলের দিকে আসে চীনেবাদামওয়ালা, এক পয়সায় এক রাশি বাদাম দিয়ে যায়। আর আসে ছোট ছোট ঠোঙায় ভরতি চানাচুর নিয়ে দু’একটি লোক-হেঁকে যায় “কুড়মুড় চানাভাজা, খেতে লাগে বড়ই মজা”।

লুব্ধ হই, কিন্তু চীনেবাদাম খাবার অনুমতি মেলে, “কুড়কুড় কুড়মুড়”-এর অনুমতি মেলে না।”

মূর্শেদূল মেরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

16 + fourteen =

এই শহর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে তথ্য-উপাত্ত্য সংগ্রহ করেছি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তা নিয়ে কিছু একটা করবার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরেই। নানা…

error: Content is protected !!