ঢাকার নামকরণ

প্রাক-মোগল যুগে ঢাকার অস্তিত্ব থাকলেও মূলত মোগল যুগে ঢাকা রাজনৈতিক গুরুত্ব লাভ করে। মোগল-পূর্ব ঢাকা সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সুলতানী শাসনামলের স্থাপত্য প্রমাণ করে প্রাক-মোগলকালে ঢাকা একেবারে বিরানভূমি ছিল না।

তবে স্থাপত্যগুলো সবই ধর্মীয় উপসনামূলক হওয়ায় সে সময় ঢাকার কোন রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল কিনা তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ তার সম্প্রতিক ঢাকার চারশ বছর পূর্তি শীর্ষক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন- “প্রায় দেড় যুগ আগেই ইতিহাসের আকার সূত্রের মাধ্যমে অনেকটা নিশ্চিত করা গিয়েছে যে ঢাকায় নাগরিক জীবনের শুরু হয়েছে কমপক্ষে ৬০০ বছর আগে। …একটি অনুল্লেখযোগ্য অঞ্চলে মোগলরা এসে ঢাকা নগরী গড়ে তুলেছিল।

হাতে প্রামাণ্য না থাকলেও ইতিহাসবোধ সম্পন্ন যে কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, মোগলরা তাঁবু ফেলতে এমন ‘অজপাড়াগাঁ’কে বেছে নেবে কেন? কারণ যখন কোন রাজ্য জয়ে মোগল বাহিনী আসে তখন এক বড় আয়োজন থাকে। 

সৈন্যবাহিনী, অস্ত্রশস্ত্র, রাজপুরুষ, প্রশাসনের কর্মকর্তা সব মিলিয়ে বিশাল বহর। শিবির স্থাপনে তাদের প্রথম পছন্দ হবে সেই জায়গা যেখানে আগে থেকে নাগরিক জীবনের স্পন্দন আছে। রাস্তাঘাট যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল। খাদ্য ও রসদ যোগাতে সুবিধা যেখানে বেশি। …বলা হয়ে থাকে, ইসলাম খাঁর ঢাকায় শিবির স্থাপনের প্রধান কারণ শীতলক্ষ্যা নদীতে বারো ভূঁইয়াদের শেষ নৌঘাঁটিতে আক্রমণ করা।…”

রাজা বল্লাল সেনের সময়কালে এ ভূখণ্ড পরিচিতি লাভ করে ‘বঙ্গ’ নামে। বলা হয়ে থাকে প্রাক-মোগল যুগে এখানে একটি শহর ‘বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি’ নামে পরিচিত ছিল। এ বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি বিশিষ্ট শহরের একটি বাজারের নাম ছিল ‘বেনগলা’।

এই বেনগলা বাজারটির খ্যাতি ছড়িয়ে পরেছিল পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও। অবশ্য ইউরোপীয় পর্যটক ও মুসলমান ঐতিহাসিকরা এই বেনগলা বাজারটিকে নগর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীতে অনেকে এ বেনগলাই আজকের শহর ঢাকা হিসেবে অভিহিত করলেও এখনো তার সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা গৌরবোজ্জ্বল শহরে পরিণত হতে শুরু করে। এ সময় দিল্লীর মোগল সম্রাটরা দেশের পূর্বাঞ্চল শাসনাধীন রাখার জন্য রাজমহলে পূর্ব-সীমান্তের রাজধানী স্থাপন করেন। কিন্তু রাজমহলের কাছে গঙ্গা নদীর গতি পরিবর্তন হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যে অসুবিধা দেখা দেয়।

পর্তুগিজ, মগ ও আফগানদের আক্রমণ থেকে বাংলার পূর্বপ্রান্ত রক্ষা করতে অসুবিধা দেখা দেওয়ায় ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নির্দেশে চৌকস সেনাপতি ও ফতেপুর সিক্রীর বিখ্যাত পীর শেখ সেলিম চিশতির নাতি শেখ আলাউদ্দীন চিশতি ফারুকী ওরফে ইজ্জুদৌলা নওয়াব ইসলাম খান বাংলার রাজধানী স্থানান্তরের অভিপ্রায়ে বিশাল নৌবহর নিয়ে পূর্বদিকে যাত্রা করেন।

তার নৌবহর বিভিন্ন স্থান পরিভ্রমণ করে বর্তনাম ঢাকা নগরীর সন্নিকটে আসার পরে সুবেদার ইসলাম খাঁ স্থানটিকে পূর্বাঞ্চলকে শাসনাধীন রাখার পক্ষে যথোপযুক্ত মনে করেন। সকল দিক বিবেচনা করে তিনি এই স্থানেই বাংলার ভবিষ্যৎ রাজধানী স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

তিনি তার অনুচরদের নিয়ে বুড়িগঙ্গা নদী তীরবর্তী স্থানে নৌবহর থেকে নেমে শিবির স্থাপন করেন। বুড়িগঙ্গা নদীর যে ঘাট দিয়ে তিনি ঢাকায় প্রবেশ করেন সে ঘাটটি পরিচিতি পায় চাঁদনী ঘাট নামে। আর ঘাট পার্শ্ববর্তী যে স্থানে তিনি প্রথম শিবির স্থাপন করেন সে বিশেষ স্থানটি তার নামানুসারে ইসলামপুর নামে পরিচিত হয়ে উঠে।

সুধীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য মনে করেন, ১৬০৮ সাল প্রকৃত পক্ষে ইসলাম খান সুবেদার হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের সময়। আবার মীর্জা নাথানের বর্ণনানুসারে ক্ষমতা গ্রহণের পর ইসলাম খান চিশতি পরপর দুই বছর “বর্ষাকাল” উত্তর বাংলার গৌড়ে ও ঘোড়া ঘাট এলাকায় অতিবাহিত করেন।

১৬১০ সালে তিনি ঢাকায় এসে পৌঁছান। এর আবার অন্যরকম ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়, ইসলাম খান নৌকা যোগে রাজধানীর স্থান নির্বাচনের উদ্দেশ্যে রাজধানী রাজমহল থেকে জুলাই ১৬০৮ সালে এ স্থানে আসেন।

ঢাকায় আসার পথে পাবনার শাহজাদপুরে পৌঁছে ইসলাম খান তিনজনের একটি অগ্রবর্তী দলকে বেশ কিছুসংখ্যক সৈন্য, কর্মকর্তা-কর্মচারী সহযোগে নৌকায় করে নতুন রাজধানীর পথে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্যে প্রেরণ করেন।

সকল দিক বিবেচনা করে ইসলাম খান ঢাকাকেই মোগল বাংলার রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করেন। ঢাকায় পৌঁছে ইসলাম খান চারিদিক পরিদর্শন করে স্থানটি রাজধানী স্থাপনের উপযুক্ত হিসেবে মনোনীত করেন।

কিংবদন্তি অনুযায়ী- বুড়িগঙা নদী তীরবর্তী স্থানে একদল সনাতন ধর্মাম্বলম্বীকে ঢাক বাজিয়ে পূজা করতে দেখে ইসলাম খান রাজধানীর স্থান নির্ধারণে এক যুগান্তকারী পথ অবলম্বন করেন। তিনি ঢাকীদলকে বুড়িগঙ্গা নদী তীরে খুব জোরে শব্দ করে ঢাক বাজানোর নির্দেশ প্রদান করেন।

তার নির্দেশ মত দক্ষিণে বুড়িগঙ্গাকে সীমানা করে তিনদল লোক পূর্ব, উত্তর ও পশ্চিম দিকে প্রেরণ করা হয়। প্রত্যেক দল ঢাকের শব্দ যতদূর শোনা যায় সেখানে পৌঁছে রাজধানীর সীমানা নির্ধরাণ করে। এভাবেই ইসলাম খান কর্তৃক এই নবীন শহরের সীমারেখা টানা হয়। ঢাক বাজিয়ে এ শহরের সীমা নির্ধারণ করা হয় বলে লোকমুখে বিবর্তনের পালাবদলে ঢাক রূপ নেয় ঢাকা’য়।

ঢাকার নামকরণ নিয়ে বেশ কয়েকটি কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। এর একটি এরকম- একবার রাজা বিজয় সেনের রানী লাঙ্গলবন্দের স্নানে যান। ফেরার পথে তার স্ত্রীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে পুত্র বল্লাল সেন। পরবর্তীতে বল্লাল সেন সিংহাসনে আরোহনের পর নিজের জন্মস্থানকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য সে স্থানে নির্মাণ করেন একটি মন্দির।

মন্দিরটির নামকরণ হয়ে যায় ঢাকেশ্বরী মন্দির। তবে এই বল্লাল সেন ইতিহাসের সেন বংশের বিখ্যাত রাজা বল্লাল সেন কিনা তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। বল্লাল সেন কর্তৃক নির্মিত ঢাকেশ্বরী বা ঢাকা ঈশ্বরী (বর্তমান ঢাকার বকশি বাজারে অবস্থিত) মন্দির থেকে ঢাকা নামের উৎপত্তি অনেকে মনে করেন।

এই কিংবদন্তিটি আবার অন্য ভাবেও প্রচলিত রয়েছে- রাজা আদিশূর ধর্ম্ববিদ্বেষ ভাব লক্ষ্য করে তার স্ত্রীকে বনবাসে পাঠানোর আয়োজন করে। রাণী এই অপমানের কারণে আত্মহত্যা করার অভিপ্রায়ে ব্রাহ্মপুত্র নদে ঝাঁপ দেন। দেবরাজ ব্রহ্মপুত্র/পুণ্যসলিল নদ তাকে সেখান থেকে রক্ষা করে বুড়িগঙ্গা নদী তীরে দেবী ভগবতীর কাছে প্রেরণ করেন।

সেস্থানে রানী একটি পুত্র সন্তান প্রসব করেন। দেবীর কৃপায় সে পুত্র বড় হতে থাকে। এই পুত্রই ইতিহাসে পরিচিতি পায় বল্লাল সেন নামে। রাজা বল্লাল সেন সে স্থানে ভ্রমণের সময় একটি দেবী মূর্তি দেখতে পান। প্রাপ্ত মূর্তিটিকে তিনি রক্ষাকত্রী ভেবে সেখানে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করে পূজার ব্যবস্থা করেন। তিনি সেই মূর্তিকে ঢাকেশ্বরী নামে অভিহিত করেন।

আবার ঢাক নামক বৃক্ষ (বৈজ্ঞানিক নাম: বুটি ফ্রনডোসা) থেকে ঢাকার উৎপত্তির কথাও বলেছেন কেউ কেউ। প্রাচীনকালে বুড়িগঙ্গা নদী তীরবর্তী এ স্থলে একটি বা অনেকগুলো ঢাক নামক বৃক্ষ ছিল। এই ঢাক বৃক্ষের নামেই পরবর্তীতে পুরো অঞ্চলটি পরিচিত হয়ে উঠে ঢাকা নামে। জানা যায়, স্থানীয়ভাবে সে সময় পলাশ বৃক্ষই ঢাক নামে পরিচিত ছিল।

কারও কারও ধারণা, অজানা লতা-পাতা-বৃক্ষে (বিশেষ করে ঢাক বৃক্ষ) আচ্ছাদিত বা ঢাকা স্থানকে পরিস্কার করে এ শহর গড়ে তোলা হয় বলে এর নামকরণ করা হয় ঢাকা।

বুড়িগঙ্গা তীরস্থ এ অঞ্চলটি প্রতিবেশী রাজ্য বিক্রমপুর (রামপাল) ও সুবর্ণগ্রামের (সোনারগাঁও) প্রায় মধ্যবর্তী, উচ্চভূমি ও নদী সংলগ্ন এলাকা ছিল। বিক্রমপুর ও সুবর্ণগ্রামের স্বর্ণযুগে মধুপুরগড় অঞ্চলের সর্বোচ্চ নদী তীরবর্তী স্থান হিসেবে স্থানটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

বহিঃশত্র’র আক্রমণ ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার জন্য এখানে একটি পর্যবেক্ষণ ঘাট স্থাপন করা হয়। ‘পর্যবেক্ষণ ঘাট’-এর আরেক প্রতিশব্দ হচ্ছে ঢাক্কা। এ ঢাক্কা থেকে ঢাকা শব্দের প্রচলন হয়ে এ অঞ্চলের নাম ঢাকা হতে পারে বলেও অনেকে ধারণা করেন।

মোহাম্মদ আবদুল মান্নান তার বঙ্গভঙ্গ থেকে বাংলাদেশ গ্রন্থে উল্লেখ করেন- “কলহনের ‘রাজতরঙ্গীণী’তে ঢাক্কা শব্দের উল্লখ আছে। ঢাক্কা অর্থ নৌ আক্রমণ প্রতিরোধের দুর্গ। ইসলাম খানের আগে থেকেই ঢাকায় মুগলদের নৌ দুর্গের অস্তিত্ব ছিল”।

সত্তুরের দশকেও এ শহরের নাম ইংরেজি উচ্চারণ DACCA ঢেক্কা বা ডাক্কা ছিল। পরে আশির দশকে সরকারি উদ্যোগে এর উচ্চারণ DACCA থেকে Dhaka (ঢাকা) করা হয়। রাজতরঙ্গিণী-তে ঢাক্কা শব্দটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।

এছাড়াও এলাহাবাদ শিলালিপিতে উল্লেখিত সমুদ্রগুপ্তের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ডবাকই এ ঢাকা বলেও কেউ কেউ চিহ্নিত করেন। আবার মৌর্য সম্রাট সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ রচনায় ‘দবক’ নামক স্থানটিকে কোন কোন ঐতিহাসিক ঢাকা হিসেবে অনুমান করেছেন।

প্রাচীন আমলে ঢাকা খুবই সমৃদ্ধ ও বাণিজ্যিক জনপদ ছিল বলে একে বাহান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি নামেও ডাকা হতো। জনশ্রতি রয়েছে, আদিতে এখানে ৫২টি বাজার আর ৫৩টি সড়ক ছিল বিধায় এ শহরের নামকরণ হয় এরূপ। এ বায়ান্ন বাজারের এক বাজার ছিল বাঙলা বাজার।

এফ বি ব্রাড্লী বার্ট তার রোমান্স অব অ্যান ইস্টার্ন ক্যাপিটাল নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, সম্ভবত ইসলাম খার আমলের পূর্বেই কাছাকাছি স্থাপিত অনেকগুলো বাজারের মধ্যে একটি ঢাকা নামে পরিচিত হয়ে আসছিল এবং এ-সব বাজার নিয়ে এ শহর গড়ে উঠেছিল।

অপর সূত্র থেকে জানা যায়, এ অঞ্চলের আঞ্চলিক বা প্রকৃত ভাষা পরিচিত ছিল ঢাকা নামে। সে থেকেও এর নাম ঢাকা হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। বীরভূম জেলার আবিষ্কৃত সুলতান বারবাক শাহের আমলে ১৪৬০ খ্রিস্টাব্দে উৎকীর্ণ এক শিলালিপিতে ‘কসবা ঢাকা-খাস্’-এর উল্লেখ রয়েছে। ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দে জেয়াও-দ-বারোসের আঁকা মানচিত্রেও উল্লেখ রয়েছে ঢাকার।

আইন-ই-আকবরী গ্রন্থে সমগ্র পরগণাটি ঢাকাবাজু নামে উল্লেখ রয়েছে। কেদারনাথ মজুমদারের ঢাকার বিবরণ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে- “১৫৮২ সালে টোডলমল ঢাকা বাজুর (পরগনার) বন্দোবস্ত করেন। তৎকালে বুড়িগঙ্গার উত্তর তীরভূমি ঢাকা বাজু নামে সরকারের বাজুহার অর্ন্তগত ছিল।

বাংলার ভাটি অঞ্চলের স্বাধীন বারো ভূঁইয়াদের বিরুদ্ধে মোগল সম্রাট আকবরের সেনাপতিদের অভিযান পরিচালনার জন্য ঢাকা বাজু ছিল ১৫৮৩ থেকে ১৬০৫ সাল পর্যন্ত একটি থানা বা দুর্গ”।

মোগল বাংলার রাজধানী স্থাপনের পরে ১৬১০/১৬১২ সালে সুবেদার ইসলাম খান দিল্লি সম্রাটের নামানুসারে এ শহরের নামকরণ করেন জাহাঙ্গীর নগর। প্রকৃতপক্ষে এ নাম কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল বলে ঐতিহাসিকদের ধারণা।

ঢাকা নামের উৎপত্তি যাই হোক না কেন এ শহরের উৎপত্তি আরো অনেক পূর্বে। মোগল শাসনামলে প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ঢাকার গুরুত্ব বাড়লেও শিল্প বাণিজ্যের উৎকর্ষতার কারণে ঢাকার খ্যাতির ইতিহাস আরো প্রাচীন।

ঢাকায় মোগল শাসনামলের পূর্বের সুলতানি আমলের বিনত বিবির মসজিদ ছাড়াও ধোলাই খাল ও বুড়িগঙ্গা নদীর সংযোগস্থলের স্থানে বেগ মুরাদের দুটি দুর্গ, বর্তমান জেলখানার স্থলে ঢাকা কেল্লা, মিরপুর মাজার, নসওয়ারা গলির মসজিদ এ শহরের প্রাচীনত্ব প্রমাণ করে।

ঢাকা রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি পেলে পরিত্যক্ত হয় পূর্বের রাজধানী সোনারগাঁ। ঢাকা থেকে ২০ মাইল দূরের সোনারগাঁ-এর দালান-কোঠা-অট্টালিকার গা থেকে খুলে আনা ইট-পাথর দিয়ে রচিত হয় নতুন রাজধানী ঢাকা।

বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ গ্রন্থ’র রচয়িতা কামরুদ্দীন আহমদ তার আত্মস্মৃতিতে লিখেছেন- “খাজা, কুট্টি, শাঁখা তিন-এ মিলে ঢাকা”। হৃদয়নাথ তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- “ঢাকা মূলত একটি বৈষ্ণব শহর”।

হাশেম সূফীর মতে, “প্রাচীন বাংলার রাজধানী হিসেবে গৌড়, পাণ্ডুয়া, সোনারগাঁও ও রাজমহল এর পরে ঢাকার স্থান। সুবেহ বাংলার রাজধানী হিসেবে মুর্শিদাবাদ ও কোলকাতার চেয়েও ঢাকা প্রাচীনতম। বৌদ্ধ আমলের ৭৫০ খৃস্টাব্দ থেকে ১১৬০ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত ঢাবাকা নামক ৪১০ বছরের সমৃদ্ধশালী বৌদ্ধ জনপদই আজকের ঢাকা মহানগরী।

১১৬০ খৃস্টাব্দ থেকে ১২২৯ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত মাত্র ৬৯ বছর ঢাবাকা তথা ঢাকা জনপদ দাক্ষিণাত্যের হিন্দু সেন বংশ দ্বারা শাসিত ছিল। দিল্লীর সুলতান ইলতুৎমীশের আমলে পূর্বাঞ্চলীয় সেনাপতি মালিক সাইফুদ্দিন আইবেক সেনবংশের অত্র অঞ্চল প্রধান সূর্যসেনকে যুদ্ধে পরাজিত করে ১২২৯ খৃস্টাব্দে ঢাবাকা তথা ঢাকা দখল করে এক চিরস্থায়ী মুসলিম বসতি স্থাপনের লক্ষ্যে ঢাবাকাকেই ঢাকা নামক এক শহরের গোড়াপত্তন দেন।

ঢাবাকা শব্দটি তৎকালীন রাষ্ট্রভাষা ফারসি ভাষায় বারবার ঢাওয়াকা উচ্চারিত হতে হতে স্বরবর্ণ ওয়াও উহ্য হয়ে পরবর্তী সময় চূড়ান্তভাবে উচ্চারণটি ‘ঢাকা’ হয়ে যায়। অর্থাৎ ঢাবাকা = ঢা+বা+কা = ঢা+কা = ঢাকা।

ঢাবাকা থেকেই ঢাকা নামের উৎপত্তি; ঢাক বৃক্ষ বা ঢক্কা বা ঢাকেশ্বরী বা ঢাক বাদন থেকে নয়। কিছু ইতিহাসবিদের মতে সমগ্র ঢাকা শহর এক সময় সুবিশাল ঢাকবৃক্ষ অর্থাৎ রেইনট্রি দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল, তাই ঢাকা নামকরণ। এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হলের সম্মুখস্থ রাস্তায় স্মৃতি স্বরূপ বিদ্যমান।”

বিভিন্ন সময় জেমস্ টেলর, ব্রাডলী বার্ট, খাজা এম আজম, যতীন্দ্র মোহন রায়, কেদারনাথ মজুমদার, হাকিম হাবিবুর রহমান, জে টি র‌্যাংকিন, মুন্সী রহমান আলী তায়েশ, সৈয়দ মুহম্মদ তাইফুর, অধ্যাপক আহমদ হাসান দানী, ড. আবদুল করিম, হৃদয়নাথ মজুমদার, আজিমুশ শান হায়দারের রচনায় ঢাকার ইতিহাস সংরক্ষণে বিশাল ভূমিকা রাখলেও ঢাকার অনেক ইতিহাসই আজ বিলুপ্ত।

ঢাকার বয়স যাই হোক না কেন রাজধানী ঢাকার বয়স চারশ বছর। ১৬০৮ বা ১৬১০ যে সালেই ঢাকাকে মোগল বাংলার রাজধানী ঘোষণা দেয়া হোক না কেন রাজধানী ঢাকার বয়স চারশ হতে চলেছে এ কথা স্বীকার করতেই হবে। রাজধানী হবার পরেও বেশ কয়েকবার ঢাকা থেকে রাজধানী অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

তাছাড়া বিদেশী সুতার অবাধ আমদানির ফলে ঢাকাই মসলিনের বিলুপ্তি ঘটে। আর মসলিনের বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ঢাকার অবক্ষয়। অন্যদিকে শাসকবর্গের বিলাসবহুল জীবনযাপন আর ভোগ বিলাসের কারণে ঢাকা তার অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। তবে রাজধানী হিসেবে ঢাকা টিকে আছে এখনো।

…………………………………………
[ফতেপুর সিক্রি: বর্তমান উত্তর প্রদেশের আগ্রা জেলায় আগ্রা শহরের অদূরে মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানীরূপে এ ফতেপুর সিক্রি নগরীর পত্তন করেন মোগল সম্রাট আকবর। ১৫৬৯ সালে এ নগরীর নির্মাণ কার্য শুরু হয়। রাজধানী হিসেবে ফতেপুর সিক্রি অনুপযুক্ত বিবেচিত হওয়ার মাত্র ১৪ বছর পরেই শহরটি পরিত্যক্ত হয়। ]

[আইন-ই-আকবরী: মোগল সম্রাট আকবরের মুখ্য সচিব আবুল ফজলের ঐতিহাসিক গ্রন্থ আইন-ই-আকবরী গ্রন্থটি ৫টি অধ্যায়ে বিভক্ত। সম্রাট আকবরের সমকালীন মোগল শাসনব্যবস্থা, ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে গ্রন্থটিতে। এছাড়াও স্থান পেয়েছে তৎকালীন ভারতের সামাজিক উৎসব, খেলাধুলা, ধর্মীয় আচার-আচরণ, খাদ্য, আমোদ-প্রমোদের বিবরণ।]

[টোডলমল : প্রথম জীবনে টোডলমল শেরশাহর সরকারে সামান্য কর্মচারী ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি মোগল সম্রাট আকবরের প্রধান দেউয়ান ও বকিল পদে যোগ দেন। কার্যত তিনি ছিলেন আকবরের প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্য উপদেষ্টা। ১৫৮৯ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।]

মূর্শেদূল মেরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

1 × 1 =

এই শহর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে তথ্য-উপাত্ত্য সংগ্রহ করেছি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তা নিয়ে কিছু একটা করবার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরেই। নানা…

error: Content is protected !!