ঢাকার পোলাও

সম্ভবত তুর্কি-আরমানিয়ান শব্দ পিলাও থেকে পোলাও শব্দের উদ্ভব। পোলাও শব্দের আভিধানিক অর্থ ঘৃতপক্ব অন্ন বা ঘি মসলা ইত্যাদি (এবং মাছ বা মাংস) সহযোগে পক্ক অন্ন। একসময় ঢাকায় নানা বাহারের পোলাও রান্নার প্রচলন ছিল। তবে ঢাকার মানুষ চাল সিদ্ধ করে পোলাও রান্নার প্রক্রিয়া পছন্দ করত না।

ঢাকার উল্লেখযোগ্য পোলাও ছিল- মোরগ পোলাও, বুনদিয়া পোলাও, মাছ পোলাও, ডিম পোলাও, মাহি পোলাও, বয়জা পোলাও, সেমী পোলাও, শরবত পোলাও, নারগেসী পোলাও যীর বিরিয়ানী প্রভৃতি। এরমধ্যে মাহি পোলাও রোহিত ও ইলিশ মাছ দিয়ে রান্না করা হতো।

খাচ্ছা পোলাও
পোলাওয়ের মধ্যে খাচ্ছা পোলাও ছিল ঢাকার সবচেয়ে জনপ্রিয়। মুরগির মাংস দিয়ে রান্না করা এই পোলাও ছিল খুবই সুস্বাদু। মুরগির মাংস টুকরো টুকরো করে এমনভাবে দেয়া হত যেন রান্না করা পোলাও চালের সঙ্গে মিশে যাওয়া সত্ত্বেও মাংসগুলো দেখা যায় আলাদাভাবে। এ পোলাও রান্নার সময় এমন পরিমাণ মত ঘি দেয়া হতো যাতে প্রত্যেকটি চাল ঘিয়ে মাখা মাখা দেখা যেত।

মোরগ পোলাও
ঢাকায় প্রস্তুতকৃত মোরগ পোলাওয়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। মোরগের মাংসের টুকরাগুলো চালের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেলেও প্রত্যেকটি চালের গায়ে ঘি দেখা যেত।

বুন্দিয়া পোলাও
বুন্দিয়া পোলাওতে দেয়া মাংসের কোফতার আকার হত মটরদানার মত। পোলাওতে দেয়া ছোট ছোট কোফতার জন্যই এর নামকরণ হয়েছে বুন্দিয়া পোলাও। বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরিকৃত কোফতাগুলো হতো নরম, ভঙ্গুর ও মোলায়েম। আর স্বাদে হতো নোনতা ও টক-মিষ্টি ।

পোলাও দমে দেয়ার সময় কোফতাগুলো এমনভাবে দেয়া হতো যেন প্রত্যেক গ্রাসে কয়েকটি কোফতা পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ঢাকায় এই পোলাও রান্নার সময় মাংসের কোফতার সঙ্গে কাঁচা সবুজ মটরদানাও দেয়া হতো।

মাছ পোলাও
ঢাকায় মাছ পোলাও সাধারণত রুই ও ইলিশ মাছ সহযোগে রান্না করা হতো। কথিত আছে, ইলিশ পোলাও রান্নাতে অভিজ্ঞতার প্রয়োজন না হলেও রুই পোলাও রান্নায় অভিজ্ঞতা ছিল বাঞ্ছনীয়। হাকিম হাবিবুর রহমানের বর্ণনায় পাওয়া যায়- “জনৈক ব্যক্তি ইলিশ পোলাও ‘বুন্দিয়া পোলাওয়ের’ পদ্ধতিতে রান্না করেছিল যা সে সময় বেশ জনপ্রিয় হয় কিন্তু এতে করে স্বাদ দ্বিগুণ হলেও খরচ ও কষ্ট বেড়ে যেত বহুগুণ।”

হোগলা পোলাও
ঢাকায় সাধারণত সাদা পোলাওকে হোগলা পোলাও বলা হতো। একসময় এই পোলাও ঢাকার পূর্বের প্রায় সকল অভিজাত পোলাওকে অতিক্রম করে প্রতি ছোট-বড় দাওয়াতে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। হোগলা পোলাও শুধুমাত্র আস্ত মশলার সাদা আখনী থেকে রান্না করা হতো এবং কোথাও কোথাও কিছু মাংসও আখনীতে দেয়া হতো।

ডিম পোলাও
পূর্বে খাসির মাংস দিয়ে এই পোলাও প্রস্তুত হয় বলে একে খাসি পোলাও বলা হতো। পরবর্তীতে একই পদ্ধতিতে খাসির মাংসের পরিবর্তে ডিম সহযোগে প্রস্তুত পোলাওকে বলা হতো ডিম পোলাও। তবে এ পোলাও ছিল ঘরোয়া খাবার। অনুষ্ঠান বা উৎসবে এই পোলাও রান্না করা হতো না।

শেবেত পোলাও বা মাক পোলাও
শেবেত পোলাও বা মাক পোলাওয়ের অন্য নাম সোইয়া পোলাও। ঢাকাতে এই পোলাও শুধুমাত্র বছরে এক দু’বার রান্না করা হতো। আশ্বিন মাসে সোইয়া শাক (শূয়ো শাক) নতুন নতুন বাজারে আসলে এই পোলাও রান্নার আয়োজন করা হতো। ঢাকা “পঁচাস বারাস পেহেলে” গ্রন্থের রচয়িতা হাকিম হাবিবুর রহমান একে উপমা দিয়েছেন- ‘এ যেন শীতের আগমনের বিজ্ঞপ্তি’।

মজমুয়া বা মিশ্রিত পোলাও
একসময় ঢাকায় মজমুয়া বা মিশ্রিত পোলাও ছিল বেশ জনপ্রিয় খাবার। বলতে গেলে ঢাকা থেকে এই পোলাও সম্পূর্ণ বিলুপ্তই হয়ে গেছে। কারণ এই পোলাও রান্নায় যে মুন্সিয়ানার প্রয়োজন তা এখনকার বাবুর্চিদের সাধ্যের বাইরে। এই পোলাওয়ের বিশেষত ছিল, একই ডেগ থেকে ৩/৪ স্বাদের ও রং বেরঙের পোলাও বের করা হতো। এই পদ্ধতিতে রান্না করা পোলাও যেন এক ধরনের শিল্প।

মাগলুবা পোলাও
মাগলুবা পোলাও ইরানিদের খুব পছন্দের একটি খাবার হলেও ঢাকাতে এটি ঢাকার মোগল ও আরমেনিয় পরিবারের বিশেষ খাবার। তারা এ মাগলুবা পোলাও রান্নায় ছিল সিদ্ধহস্ত। এই পোলাও রান্নার সময় মোরগের মাংসের পরিবর্তে খাসির চর্বিহীন মাংস দেয়া হতো। সমপরিমাণ মাংস ও চালের সঙ্গে কপি, গার, শালগম, বীট, টমেটো ভেজে দমের সঙ্গে দেয়া হতো।

নার্গিসী পোলাও
নার্গিসী পোলাও মূলত মাগলুবা পোলাওয়ের একটি বিশেষ পদ্ধতি। মাগলুবা পোলাও রান্নার সময় বিশেষ প্রকিৃয়ায় পালং শাক দেয়া হলেও হয়ে যেত নার্গিসী পোলাও। লাল করে ঘিয়ে ভাঁজা সিদ্ধ ডিম মাঝ বরাবর কেটে পরিবেশনের সময় ডিশে দেয়া ছিল এর বাড়তি আকর্ষণ।

মূর্শেদূল মেরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

11 − three =

এই শহর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে তথ্য-উপাত্ত্য সংগ্রহ করেছি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তা নিয়ে কিছু একটা করবার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরেই। নানা…

error: Content is protected !!