পেশাজীবী

মানুষের আদি পেশা কি ছিল এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে সাধারণভাবে ধরে নেয়া হয় শিকারই মানুষের আদি পেশা। আদি পেশা শিকার হলেও সময়ের আর্বতে সমাজে জন্ম নিয়েছে অগুণিত পেশা। সময়ের প্রয়োজনে গড়ে ওঠা বিচিত্র সব পেশায় মানুষ জড়িয়ে গেছে তার প্রয়োজনে। পেশার ইতিহাস দেখতে গেলে দেখা যায় আদিতে কোন কোন পেশা চলে এসেছে পুরুষের পর পুরুষ ধরে।

অনেকে ভালবেসে থেকে গেছে পৈত্রিক পেশায় ; অনেকে আবার এ নিয়ম থেকে বেড়িয়ে নতুন পেশায় যুক্ত হয়েছে। নিজ কাজকে ভালোবেসে বা না ভালোবেসে ভিন্ন ভিন্ন পেশাজীবী মানুষজন জেনে বা না জেনে যুগে যুগে ভূমিকা রেখে চলেছে সমাজ ও মানুষের কল্যাণে।

একেক মানুষের সাফল্য আসে এক এক পেশায়। সারাজীবন ধরে কাজ করেও কেউ কেউ নিজের সাফল্য জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারে না। আবার কেউ কেউ তরিৎ সাফল্য পেয়ে যায়। নাম ছড়িয়ে পরে চারপাশে। কারো কারো কর্মের সফলতা আসতে সময় লাগে ; নিজে তার সফলতা ভোগ করতে না পারলেও পরবর্তী প্রজন্ম ভোগ করে এর সুফল।

যতদূর জানা যায়, আদিতে পেশা প্রাপ্ত হত উত্তরাধিকার সূত্রে। ইচ্ছা করলেই মানুষ যে কোন পেশা বেছে নিতে পারত না। সে সময় সামাজিক অবস্থান নির্ণয় করা হত পেশার ভিত্তিতে। সামাজিকভাবেই চাপিয়ে দেয়া হত নির্দিষ্ট পেশা। অনেকসময় শাস্ত্রের দোহাই দিয়েও মানুষকে বাধ্য করা হয়েছে বহু পেশায় আবদ্ধ থাকতে। কখন বা শাসকবর্গের চাপিয়ে দেয়া পেশা পালন করতে বাধ্য হয়েছে অসহায় মানুষ।

যাদের অদম্য পরিশ্রমে গড়ে উঠেছে আজকের এই তথাকথিত সভ্য সমাজব্যবস্থা; মজার বিষয় হলো তাদের কথা খুব একটা উঠে আসেনি ইতিহাসের পাতায়। বেশিরভাগ ইতিহাস গ্রন্থ রচিত হয়েছে শাসকবর্গের গুণকির্ত্তণ গেয়ে। তাই নিম্নবর্গের ইতিহাস থেকে গেছে আড়ালে।

সমাজিক অবস্থান ও টিকে থাকার জন্য একই পেশার মানুষ নির্দিষ্ট স্থানে সংঘবদ্ধভাবে বাস করার রেওয়াজ রয়েছে সমাজে। তবে এটি নিম্নবর্গের পেশাজীবীদের ক্ষেত্রেই বেশি পরিলক্ষীত হয়। একটা সময় গেছে এই ভারতবর্ষে যখন পৈত্রিক পেশা থেকে বেড়িয়ে কেউ অন্য কোন পেশা গ্রহণ করলে সমাজচুত্য করা হত। সেই সব পরিবারে নেমে আসতো অনবর্ণনীয় দুর্ভোগ।

চরম অর্থনৈতিক সংকটেও একঘরা হওয়ার ভয়ে কেউ পরিবর্তন করার সহজ করত না পৈত্রিক পেশা। অবশ্য শাসকবর্গের সুবিধার জন্য নতুন নতুন সৃষ্ট পেশাতে যুক্ত হতে অনেক পেশাজীবীকে বাধ্যও করা হত। এরমধ্যে ইংরেজ শাসনামলে নীল চাষের কথা সবচেয়ে বেশি ইতিহাসের পাতায় দৃষ্ট হয়।

পেশা সম্পর্কে একটু গভীরে দেখতে গেলে দেখা যায়, প্রতিটা পেশাতেই থাকে কিছু গোপনীয় বিষয়বস্তু। পেশাকে টিকিয়ে রাখার জন্য এই গোপনীয়তা রক্ষা করা নিজ নিজ পেশার শ্রমিকদের জন্য অত্যাবশ্যকীয়।

পেশাগত গোপনীতা রক্ষার্থে ঢাকার পেশাজীবীরা সাধারণত নিজেরদের মধ্যেই বিয়ে-শাদী করত এবং একই পেশাজীবীরা একত্রে বসবাস করত। ঢাকার তৎকালীন সমাজে ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের মতোই ছিল শ্রেণীভেদ; সেকারণে এক পেশার মানুষ অন্য পেশাজীবীদের সঙ্গে একত্রে বসবাস করতে পারত না।

এক জাতের মানুষ অন্য জাতের মানুষের স্পর্শও সহ্য প্রত্যাশা করত না। অনেকক্ষেত্রে নিচু জাতের মানুষকে কোন প্রকার সামাজিক মর্যাদাই দেয়া হত না।

তবে শুধু পেশাকে টিকিয়ে রাখার জন্যই নয়, বিপদ-আপদে একে অন্যেকে সাহায্য করার জন্য এবং নিজেদের সংস্কার ধরে রাখার জন্যেও তারা একত্রে থাকতেই পছন্দ করত। তাদের বসবাসকারী একালাগুলোও পরিচিত হয়ে ওঠে তাদের বা তাদের পেশার নামের উপর ভিত্তি করে।

ঢাকার সমৃদ্ধকালে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বিশ্বের বহু দেশ থেকে মানুষ এ শহরে এসে বসতি গড়ে তোলে। প্রচলিত ছিল, সমৃদ্ধশালী এই শহর ঢাকায় আগত ব্যবসায়ীরা অল্পদিনেই তাদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারত।

ইংরেজ শাসনামলের নথিপত্রেও দেখা যায়, এ অঞ্চল ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সর্ব্বোৎকৃষ্ট। এ শহরে নগণ্য লবণ-গাঁজা-চামড়ার ব্যবসা করেও অনেকেই হয়েছেন ধনাঢ্য জমিদার। মসলিন, চামড়া শিল্পে অর্থ লগ্নি করে মানুষ রাতারাতি বনে গেছে জমিদার।

সেসময় পূর্ববঙ্গের বড় বড় জমিদাররা পাড়ি জমাত কলকাতায়। ছোটখাট জমিদাররা থেকে যেতে ঢাকায়। অনেক জমিদার আবার বছরের নির্দিষ্ট একটি সময় আসতেন এই শহর ঢাকায় ; বছরের অন্যান্য সময় যদিও তারা থাকতেন ঢাকার বাইরে।

কালের বিবর্তনে জমিদারদের পাশাপাশি এই শহরের বেশ কয়েকটি পেশার মানুষও উচ্চবিত্তের তালিকায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল। এই তালিকায় প্রথমেই ছিল শহরের আইন পেশায় নিয়োজিত উকিল-মোক্তার, তারপরেই ছিল শিক্ষকদের স্থান।

শিক্ষা, ব্যবসা ও চাকরির উদ্দেশ্যে আশপাশের গ্রামগঞ্জ থেকে অনেকে আসত ঢাকায়। এদের অনেকে স্থায়ী বসতি গড়ে তুলত। বিশ শতকের তৃতীয় দশকের পর থেকে ঢাকায় তাদের একটি দৃঢ় অবস্থান লক্ষ্য করা যায়।

এ অংশের আলোচনার মূল বিষয় ঢাকার আদি পেশাজীবী। তবে নিম্নবর্গের কোন পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচিত হয়নি বলে তাদের সম্পর্কে সামান্যই জানা যায়। তাই ঢাকার পেশাজীবীদের আলোচনায় উঠে এসেছে ঢাকার অনেক ব্যক্তি চরিত্র। এতেও ধারণা পাওয়া যায় তৎকালীন ঢাকার জীবনযাত্রার খণ্ডিত অংশ।

পেশাজীবীদের মজুরী থেকে ধারণা পাওয়া যায় সমাজে তাদের অবস্থান ও শ্রমিকের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। শ্রমিকদের ঠকিয়ে নেয়ার চিত্রটি শাসকবর্গের চিরচিরায়িত কাহিনী। ঢাকার মসলিন তাঁতী, নীলচাষীসহ আরো অনেক শ্রমজীবী মানুষের নাম রয়েছে এই তালিকায়।

মূর্শেদূল মেরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

8 + nine =

এই শহর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে তথ্য-উপাত্ত্য সংগ্রহ করেছি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তা নিয়ে কিছু একটা করবার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরেই। নানা…

error: Content is protected !!