ঢাকার শিলালিপি

মানুষের মধ্যে পারস্পারিক যোগাযোগের প্রধান ও শক্তিশালি মাধ্যম ভাষা। পৃথিবীর আদিতম ভাষা কবে কোথায় জন্ম নিয়েছিল সে ইতিহাস আজো মানুষের অজানা। তবে মানুষ তার পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য নিজেই তার শব্দকে রূপ দিয়েছে ভাষায়।

অঞ্চল-জাতি-গোত্র-সভ্যতা-সীমানা ভেদে ভাষার বৈচিত্র থাকলেও মানুষ একে অন্যের ভাষা বোঝার উপায় নিজেরাই খুঁজে নিয়েছে। যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালি মাধ্যম ভাষা হওয়ায় শাসকবর্গ যুগে যুগে ভাষাকেও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালিয়েছে। এতে প্রতিদিন পৃথিবীর বুক থেকে শব্দের পাশাপাশি বহু ভাষাও হারিয়ে যাচ্ছে।

বাংলা অঞ্চলের আদি এই জনপদ ঢাকাতে সময়ের পালাবদলে এসেছে বহু বিদেশী শাসক, ধর্মপ্রচারক, বণিক, পর্যটক, পেশাজীবী। তাদের সঙ্গে ঢাকাতে এসেছে নানাবিধ ভাষা। এরমধ্যে বেশ কয়েকটি ভাষা ঢাকায় রাজত্ব করেছে দীর্ঘদিন।

বিভিন্ন সময় ঢাকায় প্রচলিত উল্লেখযোগ্য ভাষার মধ্যে- বাংলা, উর্দু, আরবি, ফারসী, ইংরেজি প্রভৃতি। এছাড়াও বেশ কিছু শব্দ বিভিন্ন ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় স্থান করে নিয়েছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য- তুর্কি, পর্তুগিজ, হিন্দি, আফগানিস্তান প্রভৃতি।

স্বাধীন সুলতানী শাসনামলের ঢাকা সম্পর্কে খুব বেশি জানা না যাওয়ায় তৎকালীন ভাষা সম্পর্কেও খুব বেশি জানা যায় না। তবে সে সময় সুলতানরা আরবি ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন বলে জানা যায়। তৎকালীন শিলালিপিতেও দেখা যায় আরবি লিপি।

পরবর্তী মোগল শাসনামলে এ অঞ্চলের ভাষার ওপর বেশ প্রভাব পরে। মোগলরা পূর্বের আরবি ভাষার পরিবর্তে ফারসী ভাষার ব্যাপক প্রচলন করে। মোগল শাসনামলের শিলালিপি বা মসজিদের গায়ে উৎকীর্ণ লিপিগুলো আরবির বদলে ফারসী ভাষায় লিপিবদ্ধ করা হয়।

এ সময় প্রশাসন ও রাজস্বের কাজে ফারসী ভাষা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে আরম্ভ করে। বাংলায় মোগল শাসনামলে ঢাকার উচ্চবিত্তের ভাষা ছিল উর্দু ও ফারসী। সাধারণ জনতার ভাষা ছিল হিন্দি, উর্দু, ফারসী ও আরবি ভাষার মিশ্রণে সৃষ্ট হিন্দুস্তানী ভাষা।

বিভিন্ন সময় সরকারি ভাষা আরবি ও ফারসী হওয়ায় স্থানীয় ভাষা বাংলায় বহু আরবি ও ফারসী শব্দ শব্দ প্রবেশ করে। ধীরে ধীরে এসব শব্দ বাংলা সাহিত্যকেও প্রভাবিত করে। পরবর্তী ইংরেজ শাসনামলে ফারসী ভাষার জায়গায় ধীরে ধীরে ইংরেজি আসন করে নেয়।

বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় কাজে এর ব্যাপক ব্যবহার শুরু হলেও পরবর্তীতে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মাঝে এর ব্যবহার বাড়তে থাকে। রাষ্ট্রীয় কাজে ইংরেজির ব্যবহার ব্যাপকভাবে চালু করলেও ইংরেজরা চলতি ভাষায় কোন বাঁধা সৃষ্টি করেনি।

একসময় ঢাকার বুক চিরে ধোলাই খালের একটি অংশ শহরকে পূর্ব-পশ্চিমে দুই ভাগে ভাগ বিভক্ত করেছিল, সে সময় খালটির অবস্থান ছিল বাবুবাজারের কাছ থেকে বংশালের দিকে।

পশ্চিম দিকের লালবাগ উর্দু বাজার এলাকার বাসিন্দা ছিল মূলত ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগতরা আর ফরাশগঞ্জ, ইসলামমপুর প্রভৃতি এলাকার বাসিন্দা ছিল খাস বাঙালি। এদের ভাষা ছিল খাস বাংলা। পশ্চিমাংশের বাসিন্দা গোয়ালা, মৈসাল প্রভৃতির ভাষা ছিল উর্দু ও মিশ্রিত বাংলা।

বাংলা ভাষায় বহু বিদেশী শব্দের সমারোহ দেখা যায়। আরবি, ফারসী, ইংরেজি, ফরাসি, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, তুর্কিসহ আরো বহুভাষার শব্দ মিশে আছে বাংলা ভাষায়।

মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান তার ঢাকায় খ্রিস্টান মিশনারীদের প্রভাব ও তৎপরতা শীর্ষক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন- “বহু ব্যাপ্টিস্ট মিশনারীও অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত (১৮৩৪) পর্তুগীজ ভাষায় গির্জায় ভাষণ ও বাইবেল পাঠ করতেন। ঢাকার গির্জাসমূহেও এ রীতি প্রচলিত ছিল।”

মোগল শাসনামলে ঢাকার রাজভাষা সম্পর্কে জেমস লঙ বলেছেন- “ ফারসী চিঠিপত্র ও নথি থেকে জানা যায় যে, সকল প্রশাসনিক ক্ষমতা মুসলমানের হাতে ছিল ; হিন্দুরা আর্থিক ও রাজস্ব বিষয়ে জড়িত ছিলেন, তাদের হাতে কলম ছিল, তারা রাজভাষা ফারসীতে অফিসের কাজ চালাতেন।”

বিশ শতকের সূচনালগ্নে রচিত শ্রী কেদারনাথ মজুমদারের ঢাকার বিবরণ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে- “ঢাকা সহরের নিম্নশ্রেণীল লোকের ভাষা বড়ই কদর্য্য। উহাই প্রকৃত মুসলমানী বাঙ্গালা। এই মুসলমানী বাঙ্গালা ভাষায় পুস্তক প্রচার জন্য মুসলমান শিক্ষা সমিতিতে প্রস্তাব হইয়াছিল।

শিক্ষিত মুসলমানদিগের বিশেষ আপত্তি নিবন্ধন প্রস্তাব পরিত্যক্ত হইয়াছে। ঢাকা নগরের উচ্চশ্রেণীর অধিবাসীদিগেরও ভাষা কর্কশ।”

বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ও সেতার বাদক সাঈদ আহমদ তার স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ জীবনের সাত রং গ্রন্থে উল্লেখ করেন- “মুসলমানেরা ছিল সবাই আঞ্চলিক উর্দুভাষী আর হিন্দুরা ছিল বাংলাভাষী। মুসলমান পুরুষেরা বাংলা বলতে পাড়লেও অন্দরমহলে তখনো বাংলার প্রচলন হয়নি। মেয়েদের লেখাপড়া উর্দু ও আরবি পড়াতেই সীমাবদ্ধ ছিল।”

কামরুদ্দিন আহমদ তার বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ গ্রন্থে পঞ্চাশ বছর আগের ঢাকার স্মৃতিকথায় লিখেছেন- “মুসলমান ছেলেরা তখনকার দিনে, অন্তত ঢাকা শহরে-বাংলাকে মাতৃভাষা বলে ভাবতে শিখেনি। খাজা পরিবারের লোকেরা উর্দু বলত, ঢাকার রইছ কুট্টি ও শাঁখারীরা উর্দু ও বাংলার একটা খিচুড়ী বানিয়ে সেটাকেই মাতৃভাষা বলে চালিয়ে দিয়েছিল।

ঢাকার বুর্জোয়াঁ হিন্দুরা বাঙ্গালদেশীয় বাংলা বলত আর আধা-সামন্তবাদী বুর্জোয়াঁ মুসলমান সম্প্রদায় খাজা সাহেবদের সঙ্গে মেশার জন্য এবং চাকরবাকর শাসাবার জন্য আর বিশেষ করে তারা যে বাংলার বাইরের মুসলমান তা প্রমাণ করার জন্য উর্দু ভাষার চর্চা করত।

দেশের নেতারা যেখানে উর্দুভাষী-অনুগামীরা অন্য ভাষাকে স্বাভাবিক কারণেই তেমন আপন ভাষা বলে ভাবতে পারেনি। আমাদের অবস্থা ছিল মাতৃভাষাহীন একটি জাত যারা উর্দুতে মাতৃভাষা বলে মিথ্যা দাবী করতে চাইত আর বাংলাকে বিমাতা মনে করে দূরে ঠেলে রেখেছিল।”

মূর্শেদূল মেরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

9 − seven =

এই শহর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে তথ্য-উপাত্ত্য সংগ্রহ করেছি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তা নিয়ে কিছু একটা করবার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরেই। নানা…

error: Content is protected !!