রমনা পার্ক

-মূর্শেদূল মেরাজ

রমনা নামকরণ মোগলদের। অনেকে মনে করেন, রমনা একটি ফারসি শব্দ, ইংরেজিতে যার অর্থ ল’ন। অপর সূত্র মতে, পার্শিয়ান শব্দ ‘রমনা’ অর্থ ছোট করে কাটা ঘাসে ঢাকা জমি।

তবে সিরাজুল ইসলাম তার রমনা বনাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যান লেখায় দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন- “ঐতিহাসিকভাবে রমনা ঢাকা শহরের একটি অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থান। … ‘রমনা’ একটি সংস্কৃত শব্দ। এর অর্থ রাষ্ট্রীয়ভাবে রক্ষিত একটি স্থান, যেখানে নগরবাসী যায় রমন বা আনন্দ ভ্রমণ করতে, সময় কাটাতে কিংবা শিকার করতে।

দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন প্রাচীন নগরে বিনোদনের জন্য রমনা নামে নির্দিষ্ট স্থান ছিল। ধ্রুপদী শব্দের বিখ্যাত অভিধান হবসন-জবসনে (১৮৮৬) রমনা নামক স্থানের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবে।

প্রাচীনকালে রমনাগুলো ছিল নৈসর্গিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ। যেখানে থাকত গাছগাছালির পাশাপাশি উত্তম পানির ফোয়ারা। …মুঘল ঢাকা নগরীর ঐতিহ্যবাহী রমনার আদি অবয়বে হাত বাড়ানো শুরু হয়েছে বিশ শতকের গোড়া থেকে।”

একসময় পুরানো হাইকোর্ট থেকে শুরু করে বর্তমান রমনা এলাকা, মিন্টো রোড, শাহবাগ, পুরো নীলক্ষেত এলাকা, কার্জন হল, মেডিকেলসহ সম্পূর্ণ অঞ্চলটিকেই বোঝান হত রমনা বলে।

সৈয়দ মুহম্মদ তৈফুরের মতে, পুরনো হাইকোর্ট ভবন থেকে নিয়ে বর্তমান সড়ক ভবন পর্যন্ত মোগলরাই নির্মাণ করেছিল বাগান ; যার নাম ছিল বাগ-ই-বাদশাহী বা বাদশাহী বাগান।

মোগল শাসনামলে বর্তমান নীলক্ষেত অঞ্চলে মহল্লা চিশতিয়ান ও মহল্লা শুজাতপুর নামে দুটি আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠে।

রফিকুল ইসলামের ঢাকার কথা গ্রন্থে ‘মহল্লা চিশতিয়ানে’ নামটি উল্লেখ রয়েছে ‘মহল্লা কিশ্চিয়ান’ নামে। সে সময় শুজাতপুর ছিল বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন থেকে বাংলা একাডেমী পর্যন্ত। আর পুরান রেসকোর্সের দক্ষিণ-পশ্চিম ছিল মহল্লা চিশতিয়া। এই সম্পূর্ণ এলাকাটি ছিল মৌজা শুজাতপুরের অন্তর্গত।

জানা যায়, মৌজা শুজাতপুর নামকরণ হয় ঢাকাকে রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা প্রদানকারী সুবেদার ইসলাম খান চিশতির ভাই শুজাত খান চিশতির নামানুসারে। অত্র অঞ্চলে সুবেদার ইসলাম খান চিশতির বংশের কিছু সদস্য বসবাস করত বলে এলাকাটির নাম হয় মহল্লা চিশতিয়া। তাদের অনেকের কবরও দেয়া হয় এখানে।

আদিতে এলাকাটির নাম দেয়া হয় পুরানো নাখাস যার অর্থ পুরানো দাস বাজার। সম্ভবত এসময় এখানে দাস কেনা-বেচা হত।

১৯০৩ সালে সৈয়দ মুহম্মদ তৈফুর নিজে হাইকোর্ট এলাকায় বিশাল একটি ফটক দেখতে পান, যেটি তার মতে ছিল খুব সম্ভব বাদশাহী বাগানের ফটক। ১৯০৪-১৯০৫ সালে নতুন রাজধানী নির্মাণকালে ভেঙ্গে ফেলা হয় এই ফটক এবং এ এলাকার অনেক পুরনো বাড়িঘর।

সে সময় রমনা পেরিয়ে উত্তর দিকটা ছিল জঙ্গলাবৃত্ত। এই এলাকার ভেতর দিয়ে চলে গিয়েছিল ২/৩টি খাল। মোগল শাসনামলে রমনা ছিল অভিজাত এলাকা, কোম্পানি শাসনামলে এলাকাটি হয়ে পড়ে জঙ্গলাকীর্ণ। পরবর্তী ইংরেজ শাসনামলে রমনা পুনরুদ্বারের কাজে প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করেন ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ড’স/ডরেস।

তিনি ১৮২৫ সালে জেলের কায়াদীদের দিয়ে রমনার জঙ্গল পরিষ্কার করার কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ ৩ মাস এই পরিষ্কার কাজ চলার পরে রমনার জঙ্গল পরিষ্কার করে বের করা হয় ডিম্বাকৃতির একটি অংশ। এ সময় রমনা কালী মন্দির, গ্রিক স্মৃতিস্তম্ভ, শাহবাজের মাজার, মসজিদ মোটকথা উপাসনালয়গুলো ব্যতীত রমনা এলাকার প্রায় সকল স্থাপনাই সরিয়ে ফেলা হয়।

পরিস্কৃৃত অংশটিকে কাঠের রেলিং দিয়ে ঘিরে ড’স তৈরি করেন রেসকোর্স। রেসকোর্সের পার্শ্বে ঝাউগাছ, ফারগাছ ও বিদেশী লজ্জাবতী গাছ লাগান হয়। আর পরিস্কৃত সম্পূর্ণ অংশটির নাম দেন রমনা গ্রীন।

রেসকোর্সের একেবারে উত্তর-পশ্চিমে ড’স একটি টিলা তৈরি করে তার চারদিকে লাগান ফারগাছ আর টিলার ওপর গথিক রীতির ছোট একটি ঘর নির্মাণ করেন। এ ঘরটিকে শহরের শিক্ষিতরা নাম দিয়েছিলেন ড’স ফলি বা ড’সের ভুল নামে।

সম্ভবত জঙ্গলের ভেতরে ঘরটি নির্মাণ করায় লোকমুখে এই নামটি প্রচার লাভ করেছিল।

অপর সূত্র মতে, তিনি গথিক রীতিতে একটি ছোট বিশ্রামাগার নির্মাণ করেন। সকালে রেসকোর্সে আসা অতিথিদের কফি দিয়ে আপ্যায়িত করতেন তিনি এই বিশ্রামাগারে। এসময় রমনা এলাকাটি ভ্রমণের জন্য ব্যবহার করত ঢাকাস্থ ইউরোপীয় ও স্থানীয় ধনাঢ্য ব্যক্তিরা।

মূল শহরের সঙ্গে রেসকোর্সেকে যুক্ত করার জন্য ডস এর উত্তর-পূর্ব দিকে একটি রাস্তা করেন। রাস্তাটির সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য এর দু’ধারে দুষ্প্রাপ্য নানা জাতের গাছ লাগান হয়। এ রাস্তার প্রবেশ মুখে নির্মাণ করা হয় ইউরোপীয় শৈলীতে দুটি স্তম্ভ।

অনেকের ধারণা, দোয়েল চত্বরে থেকে বাংলা একাডেমীর দিকে রাস্তার ওপরে যে ফটকটি দেখা যায় সেটি বাংলার সুবেদার মীর জুমলার নির্মাণ করেন। এজন্য একে অনেকে বলেন মীর জুমলার ফটক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ডসের নির্মিত রমনা এবং শহর সংযুক্ত রাস্তার ফটক বা স্তম্ভ। তবে এ নিয়ে মতভেদ আছে।

এই পার্ক নির্মাণের জন্য ১৯০৮ সালে লন্ডনের কিউ/কিউই গার্ডেন থেকে বিশেষজ্ঞ আনা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞের পরামর্শে ফুলের বাগান স্থাপন, বিরল প্রজাতির বৃক্ষ রোপন ও জলাশয় প্রভৃতি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা হয়। লন্ডন গার্ডেনের কর্মী রবার্ট লুইস প্রাউডলকের প্রধান সহকর্মী ছিলেন অখিল বাবু।

ড’স ঢাকা ত্যাগ করার পরে রমনা আবার অবহেলিত অঞ্চলে পরিণত হয়। ১৮৪০ সালের দিকে রাসেল মোরল্যান্ড স্কিনার ছিলেন ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট। তার ঢাকায় অবস্থানকালের দ্বিতীয় বছরে রমনা পরিণত হতে চলেছিল সুন্দর এক শহরতলিতে।

সেই সময়ই রমনার উত্তরাংশে অনেকে বাগানবাড়ি নির্মাণ করে। এর মধ্যে আরমানি জমিদার আরাতুনের বাগানবাড়ি ছিল বর্তমান আণবিক শক্তি কমিশনের স্থলে। জজ ফ্রানসিস গ্রিফিথ তার বাড়ি নির্মাণ করেন এর কিছুটা উত্তরে।

অবশ্য অবসর গ্রহণের পরে ১৮৪৪/৪৫ সালের দিকে তিনি ঢাকার তৎকালীন নবাব খাজা আবদুল গণির কাছে বাড়িটি বিক্রি করে দেন।

কয়েক বছরের মধ্যেই নবাব খাজা আবদুল গণি এখানে কান্ট্রি হাউজ নির্মাণ করেন। পরবর্তীকালে ঢাকার নবাব খাজা আহসানউল্লাহ এখানে একটি চিড়িয়াখানাও স্থাপন করেন এবং এখানে তাদের বাগানবাড়ির নাম ছিল এশারত মঞ্জিল আর পুরো এলাকাটির নাম দেয়া হয় শাহবাগ।

রেসকোর্সের উত্তরাংশে ইউরোপীয়ানরা মাঝে মাঝে খেলত পোলো।

বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পরে রমনা এলাকায় গভর্নরের একজিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট ৩টি বড় বাড়ি তৈরি করা হয়-

১. বর্ধমান হাউজ (বর্তমান বাংলা একাডেমী ভবন)।
২. হুদা হাউজ : নবাব শামসুল হুদার জন্য (বর্তমান রোকেয়া হল) এবং
৩. হুইলার হাউজ। 

এছাড়াও বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল লেফট্যান্ট গভর্নরের জন্য।

মূর্শেদূল মেরাজ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

3 × five =

এই শহর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে তথ্য-উপাত্ত্য সংগ্রহ করেছি গত এক দশকের বেশি সময় ধরে তা নিয়ে কিছু একটা করবার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরেই। নানা…

error: Content is protected !!